Saturday, December 22, 2007

সুইট ডিসেম্বর

বিবাহের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যে এরকম প্রায় পরিকল্পনাহীনতায়, আকস্মিক ঘটনার মত দুম করে ঘটে যেতে পারে এবং সেটা নাটক-সিনেমায় নয়, বাস্তবে-- সেটা নিজের জীবনে না ঘটলে সেরকম করে বুঝতাম কি করে?!

সময়ের নিম্নাঙ্গে পায়ের বদলে অতি দ্রুত গতিসম্পন্ন চাকা অথবা উর্দ্ধাঙ্গে পাখির নরম ডানা নয় হয়ত, হয়ত জেট প্লেনের ডানা লাগানো আছে। নইলে সেই আকস্মিক ২২শে ডিসেম্বর একবার এলো আমাদের জীবনে বুঝলাম, তাই বলে বছর ঘুরে আবার সেই দিনটাই উপস্থিত? আরিব্বাবা, একটা নয় দুইটা নয়, একেবারে ৩৬৫ বার পৃথিবী ঘুরান দিয়ে দিলো এর মাঝে ?

বেশ একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে নতুন করে। বিয়েবার্ষিকী উপলক্ষ্যে লজ্জাবার্ষিকী। :-)

পৃথিবীর ব্যাপার স্যাপার ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না এখনও। মাঝে মাঝে এত তীব্র হতাশা জেঁকে বসে...আবার সেই আমাতেই জ্বলজ্বল করে কোন এক আশ্চর্য আলো! ভালোবাসা...বন্ধুতা...কি মমতামাখা সব শব্দ। কি মায়াময় অনুভূতি!

এইজন্যেই বুঝি মানুষ বেঁচে থাকে। আরো বেঁচে থাকতে চায়।

হ্যাপি এনিভার্সারি তারু।

রবিবুড়ার কাছ থেকে ধার করে একটু বলি--

"তোমায় নতুন করে পা'ব বলে
হারাই ক্ষণে ক্ষণ।
ও মোর ভালোবাসার ধন"।

Saturday, December 08, 2007

আবার খেরোখাতা

ছোটবেলায় ডায়েরী লিখার অভ্যাস ছিলো খুব। ক্লাস সিক্সে এটা প্রবল হলো। তুমুল মাত্রায় বেড়ে গেলো কলেজ জীবনে। ভার্সিটির কয়েকটা বছর...তারপরে একটা বিশাল গ্যাপ। থার্ড ইয়ার থেকে শুধু ডায়েরী লিখাই নয়, প্রায় সবই কেমন স্থবির হয়ে গিয়েছিলো আমার। আবেগ মানুষের উন্নতির পথে অনেক বড় এক অন্তরায়, বিশ্বাস করি তখন থেকেই। তাই জন্য দুঃখিত নই অবশ্য আমি মোটেও। ছোট্ট যে জীবন আমরা বাঁচি সেখানে মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট, "আবেগ"ই যদি না থাকে, তো রোবটের মত সফল হবার কোন মানে নেই আমার কাছে। অবশ্য "সাফল্য" কথাটাও তথাকথিত অর্থেই লিখেছি এখানে। তো সেই প্রায় স্থবিরতা একেবারে পূর্ণতা পেলো মামণি চলে যাবার পর। এর পরের একটা বছর আক্ষরিক অর্থেই ঠিক কিছুই করি নি আমি। ক্লাসের পড়াশোনা বা অন্য বই পড়া, গান গাওয়া, ছবি আঁকা--আমার জন্য সবচেয়ে স্বাভাবিক এই কাজগুলো পুরো বন্ধ হয়ে গেলো। অনার্সটা কিভাবে পাশ করলাম সে এক বিস্ময়! আসলে মা চলে গিয়ে মানুষের জীবনের ব্যাপ্তির ক্ষুদ্রতা বড় কড়াভাবে আমার মস্তিষ্কে গেঁথে দিয়ে গেলো।

এটা এক রকম ভালোই হলো। একটা সময় ছিলো, অনেক কিছু পাবার আকাঙ্ক্ষা ছিলো। ক্লাসে ফার্স্ট না হয়ে সেকেন্ড বা থার্ড হলে মন খারাপ হত (একবার ছাড়া ফার্স্ট আমি কখনই হই নি)। এখন আর সেসব হয় না। আমি যেমন আছি তেমন করেই এই ছোট্ট জীবনটা পার করে দিতে পারলেই আমি খুশি। সাফল্য বলতে আমি এখন বুঝি একান্ত আপন সম্পর্কগুলো। শেঁকড়, সেখানে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু নেই, তবু যা আছে সেইটুকুতে বিশ্বাস রাখা, বাবা, বড় আপু, ছোট আপুকে কখনও ভুল না বুঝা, ওদের কষ্ট না দেয়া। আর যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেছে অজান্তে, স্বার্থহীনতায়- আমার বন্ধুরা। কোন মূল্যে আমি ওদের হারাতে চাই না। কখনও নিজে কষ্ট পেলেও ওদের কষ্ট দিতে চাই না। জীবনের একটা একটা ধাপে এই মানুষগুলো কতবার কতভাবে যে আশ্রয় আর প্রশ্রয় দিয়েছে নিঃশর্তে! আর আছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া- আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে জীবনসংগী হিসেবে পাওয়া। এই সবই আমার জীবনের সাফল্য, পাওনা। আর বাকি যা কিছু, সব পথ চলতে পাওয়া। পেলেও হয়, বেশ, ভালোই... না পেলে ক্ষতি কিছু নেই।

কত কি সব বলছি। ব্যক্তিগত কথা লিখে ব্লগের পাতা ভরিয়ে ফেলছি। আসলে... ইদানিং আবার আগের মত ডায়েরী লিখতে ইচ্ছা করে। মামণি, বাবা, আপুরা আর বন্ধুরা ছাড়া আর কখনই তেমন কথা বলি না আমি... এখানে, এই ভিনদেশে কোথায় পাই ওদের? তারুর সাথে বকবক করি অনর্গল। আর কারো সাথে না, আর কেউ নেই যে এখানে আমার। তাই একলা সময়ে নিজের সাথেই কথা বলি। বলতে ইচ্ছা করে। খাতা-কলমে ডায়েরী লিখা আর হবে কি না জানি না, তাই ব্লগেই আবার শুরু করলাম। একান্ত ব্যক্তিগত কথন - আমার খেরোখাতা।

Friday, December 07, 2007

হয় না এমন হয় না...

চার মাস ধরে দেশছাড়া আছি। এমনি এমনি ঘরে বসে থাকি। ঠিক এমনি এমনি না অবশ্য, জীবনে যা কোনদিন করি নি তাই করি - ঘরগেরস্থালী। বেশ লাগে। এই পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমাকে কখনও কোন ক্ষেত্রে কোন গুরুদায়িত্ব নিতে হয় নি। পরিবারের সবার ছোট আল্লাদী মেয়ে, তাই সমস্ত ঝামেলা থেকে দূরেই থেকেছি সব সময়। বড় আপু, ছোট আপুকে দেখেছি মা'র কাজে সাহায্য করতে, আমাকে কখনও সেসব ছুঁতে দেয়া হয় নি ছোট বলে। অথবা ঘরের বাইরে যাসব কাজ, কত কিছুই থাকে না? আমাকে সেসবও করতে দেয়া হয় নি। নিজের দায়িত্বটুকুও কেমন করে যেন নিতে হয় নি কখনও। বাবা-মা, দুই বোন, এমনকি বন্ধুরাও কেমন আদর করে আগলে রেখেছে আমাকে সব সময়। ইউনিভার্সিটির প্রথম তিনটা বছর যখন তারেক ছিলো, মোটামুটি চোখ বন্ধ করে হেঁটেছি আমি সবখানে, নিশ্চিত নির্ভরতায়।

এইবার, বিয়ের ছয় মাস পরে সংসার শুরু করে জীবনে প্রথম দায়িত্ব নিতে শিখলাম আমি। আশ্চর্য একটা দায়িত্ববোধ আপনা থেকেই ভর করলো আমার ওপর। মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদা- অন্ন। অতএব রান্নাবান্না দিয়ে শুরু হলো। কুটুর কুটুর করে কত কি রাঁধি। ট্রাডিশনাল রান্নার বাইরে এখান থেকে সেখান থেকে খুঁজে খুঁজে ডিফরেন্ট কিছু করার ট্রাই করি, কখনও নিজে নিজে বানিয়ে কিছু করি। রান্নার মত একটা বিষয়ে হঠাৎ করে নিজের এরকম আগ্রহ দেখে মাঝে মাঝে নিজেই ভুরু কুঁচকে ভাবি, ঘটনাটা কি?

এই সব করে করেই যাচ্ছিলো। কিন্তু আরো কিছু একটা করা দরকার, যাকে বলে উপার্জন, নিজে নিজে- এরকম ভাবছি অনেক দিন ধরেই। টুকটাক চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম ইন্টারনেট ঘেটে। ইন্টারভিউ দিলাম সেদিন একটা, মোটামুটি রেসপন্স মিললো। ট্রেনিং-এর জন্য ডাক। তারপর ক'দিন কাজ করে দেখাতে হবে, পারফর্মেন্স ভালো হলে কাজ পাক্কা, নইলে ফুটো। আমি মোটামুটি ফুটে যাবো এরকম প্রস্তুতি নিয়েই আজকে প্রথম দিনের ট্রেনিংটা করে করে এলাম। সব অন্য রকম মানুষ, বৈদেশি। আমার কেমন ভয় করছিলো। ছোটবেলায় যেমন প্রথম স্কুলে যাবার সময় মায়ের আঙ্গুল ধরে স্কুলে যেতে ইচ্ছা করত, তেমন ইচ্ছা করছিল আজকে তারুর হাত ধরে ওখানে বসে থাকব। কেউ আমাকে কিছু বললেই তারু দিবে মাইর! হি হি। কিন্তু সেসব তো আর হয় না আসলে। যেতে হলো একাই। বকর বকরও করতে হলো, কারণ জবটা কল সেন্টার কাস্টমার সার্ভিস। কি যে জ্বালায় পড়লাম, আমি দুনিয়ার অন্তর্মুখী কম কথা বলা মানুষ, আর আমি কিনা...

কোম্পানীটা ইন্ডিয়ান। যাদের কাজে ডেকেছে তারা সবাই-ই ইন্ডিয়ান, আমি একা এক বাংলাদেশী। অনেক চটপটে ছেলেমেয়েগুলো। বয়সে আমার থেকে কম বই বেশি নয় কেউই। কি সুন্দর পটপট করে কথা বলে যাচ্ছিলো। আর আমি মুখে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বসে থাকি। মাঝে মাঝে একটা দুইটা কথা বলি। স্বভাব। বন্ধু-বান্ধব আর খুব পছন্দের মানুষ ছাড়া কথার খই আমার না ফুটেই বসে থাকে। তিন দিনের ট্রেনিং, ভালোই চলছে। হাসিখুশি ছেলেমেয়েগুলোর সাথে বসে থেকে, কথা বলে ভালোই লাগছিলো বেশ। ট্রেনিং শেষে দরজার বাইতে পা-টা রেখেই দুম করে গেলো মনটা খারাপ হয়ে। এরা সবাই বাঙালী হত, এরা আমার সেই সব চেনা বন্ধুরা হত...আমি কত শান্তি পেতাম তাহলে! তাই কি আর হয়? হয়? হয় না তো!

Thursday, December 06, 2007

সেই...

একটু একটু করে একটা সময়ে ভেঙ্গেই পড়ে সব কিছু আসলে। প্রথম যখন হুমায়ূন আযাদের " সব কিছু ভেঙে পড়ে" পড়েছিলাম, স্বপ্নবাজ আমার হজম হয় নি...মাথা গুলাতে গুলাতে কেমন যেন গা গুলিয়ে বমি পেলো। সারা রাত আমি ঘুমুতে পারি নি...চেপে রাখা রোষময় বিস্ময়ের সবটুকু পরের দিন ঢেলে দেই প্রিয় বন্ধুর কাছে। "এমন হয়? এমন হয় বল?" রু আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। বোধহয় উদভ্রান্ত অবুঝ বন্ধুকে সত্যি বলে আরো উন্মাদ করে দিতে চায় না। আমি অস্থির হয়ে রু'কে তাগাদা দি, " বলিস না কেন কিছু?" রু ওর দু'হাতের তালুতে আমার হাত চেপে ধরে, বলে, "না রে, সব কিছু কি আর এমন হয়? আমাদের চারপাশটা আমরা দেখছি না? ঠিকই তো চলছে সব, কখনও কোথাও হয়ত এমন হয়। তাই বলে সব এভাবে ভেঙ্গে পড়ে না..." ক'টা দিন তবু আমার অস্বস্তিতে কাটে, কেমন অবিশ্বস্ত মনে হয় সব কিছু। রু আমাকে আগলে রাখে- মমতায়, বন্ধুতায়, ভালোবাসায়...।

সেদিন রু'র কথা মেনেছিলাম আমি।

তারপর...

এখন আমি চোখ বুজে, মন বুজে সব কিছুর ভাঙ্গন দেখি।

একেকটা রাত যায় নির্ঘুম...দিনগুলো হাসিমুখে বিষন্ন মনে...মাথা ভারী হয়ে আসে...ফেলে আসা দেশের একটা একটা খবর - ব্যক্তিগত, পারিবারিক অথবা সামষ্টিক, ওলটপালট করে দেয় একান্ত নিজস্ব সুখের সময়গুলোকে। চোখের সামনে, অথবা আড়ালে ভেঙ্গে পড়ার শব্দ শুনি কেবল আমি...ইচ্ছা করে সেই ভাঙ্গনের উৎসবে নিজেকেও সামিল করতে। কানের কাছে ঋতূপর্ণ ঘোষের সিনেমার ডায়ালগ ভন ভন করে, " কনস্ট্রাকশন, ডিকনস্ট্রাকশন...কনস্ট্রাকশন, ডিকনস্ট্রাকশন..."। আমি কিছু কনস্ট্রাক্ট করতে পারি না। ভাঙ্গতে ইচ্ছা করে তাই। ডাউললোড ডট কম থেকে ভেঙ্গে ফেলার সরঞ্জাম যোগাড় করি আমি, ডিএক্স বল, সবচেয়ে পুরনো ভার্সন। খেলতে শুরু করি। অথবা ভাঙতে। টং টং করে একটা একটা ব্রিক ভাঙে। আমার ভালো লাগে না, ভলিউম বাড়িয়ে দি... অপেক্ষা করি একটা "ফায়ার বল" আসুক, একটা "থ্রু ব্রিকস" আসুক, একটা গুল্লি আসুক... আমি ঢিসঢাস, সটাং সটাং করে ভেঙে ফেলি সব ব্রিকস, ভাঙার শব্দ শুনি...

তারপর আর পারি না...ডিকনস্ট্রাকশনের তোড়ে হাঁপিয়ে উঠি...তারপর আবার...আবার রু আমাকে আগলে ধরে। নোনাজল আর ভালোবাসার কনস্ট্রাকশন...

ভেঙে পড়ে, পড়তে থাকে অনেকদিনের বাঁধন...
এবং গড়ে ওঠে অন্য পাড়ে...

চলে যাওয়া জননীর মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মরে গেছে সেই জননী, আমাকেই জননী হবার স্বপ্ন দেখিয়ে!

কনস্ট্রাকশন...ডিকনস্ট্রাকশন...কনস্ট্রাকশন...ডিকনস্ট্রাকশন...

Saturday, November 24, 2007

"তারা আমাদের ভাই, মানব ভাই..."


দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ-সামগ্রী যে তাদের কাছে না গিয়ে অনেক সময়ই কোথায় যায় তা বোধহয় আমরা এখন ভালোই জানি। দুদকের অভিযানে দরিদ্র মানুষের অধিকারের ত্রাণের টিন, কাপড়, এমনকি বিস্কুট (!) পরিহাস করতে করতে মুক্তি পেয়েছে পেটমোটা বোয়ালগুলোর বাড়ি থেকে। কাজেই, যতই মরুক মানুষ ঘূর্ণিঝড়ে, যতই তাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাক, যতই তাদের সদ্য পাকা ফসল মিশে যাক মাটির সাথে ইউপি চেয়ারম্যানের তাতে কি? ত্রাণের জন্য ৩৮৫ কেজি চাল পাওয়া গেছে, এতে আর ক'দিন, ক'জনের চলবে? তার'চে যার আছে তার আরেকটু বাড়ুক...এই যুক্তিতেই বুঝি আটকে দিয়েছিলো ত্রানের চাল। অতিকায় পিরানহা দেখে উদ্বুদ্ধ হওয়া এই বোয়াল অবশ্য পার পেলো না, কেমনে কেমনে জানি ধরা পড়ে গেলো। তার সাধের হঠাৎ পাওয়া চালগুলো চলে গেলো আধমরা মূল্যহীন মানুষগুলোর কাছে।

এসব খবর এখন আমাদের পুরোপুরি চোখ সওয়া, মন সওয়া। বিকার হয় না তেমন কোন পড়ে। অন্য খবরে চলে যাই তাই, আগে পাতা উল্টাতাম, এখন মাউজ ক্লিক করি, এই কেবল পার্থক্য। চোখের সামনে একের পর এক দুঃসংবাদ...তারপর হঠাৎ কোন খবরে আমাদের সব সয়ে যাওয়া চোখ হঠাৎ ভিজে উঠে। হায়, ইউপি চেয়ারম্যান নিজের থাকতে কেড়ে নিয়েছিলো, আর এই নিঃসহায় মানুষগুলো...!

না তেমন কিছু নয় ওরা, ওরাও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এক জনপদ- বাগেরহাটের জয়মনির ঘোল গ্রাম। ঘূর্ণিঝড়ে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙেছে অনেকের, গাছ ভেঙ্গেছে, ফসল নষ্ট হয়েছে। তবু ঠিক পাশেই শরণখোলার ভয়াবহ রূপের কাছে ওদের ক্ষতি কিছু নয় জেনে নিজেদের সামাণ্যতম সম্বলগুলো ভালোবেসে তারা দিয়ে এসেছে প্রতিবেশী গ্রামকে। জয়মনি অঞ্চলে খাবার পানির বড় অভাব, বৃষ্টির পানি সঞ্চয় করে তাই সারাবছর ধরে ব্যবহার করতে হয় তাদের। সেই মহামূল্য সম্পদ থেকে তিন হাজার বোতল এবং পঞ্চাশটি বড় ড্রাম ভরে প্রায় ৫০০০ লিটার পানি দিয়েছে তারা শরণখোলার সাউথখালী গ্রামের মানুষকে। নিজেরা অতিসামান্য সম্বল থেকে কাপড়, শীতের কাপড়, খাবার, ওষুধ, স্যালাইন যা পেরেছে তাই দিয়ে দাঁড়িয়েছে তারা অপেক্ষাকৃত বেশি অসহায় মানুষগুলোর পাশে। এখানেও ইউপি চেয়ারম্যান আছে, তার ডাকেই সব মানুষ এক হয়েছে মানবতার খাতিরে। কত অবলীলায় সুন্দর আলী খাঁ বলতে পারে, "তারা আমাদির ভাই, মানব ভাই। আমার এক ভাই কষ্ট করতিছে, তাই দিছি"।

কিছুই নেই তাদের, আছে কেবল মানবতাবাদী মন। আছে যে সে খবর হয়তো জানেও না তারা। কখনও চর্চা করে নি, কখনও এক লাইন দাম্ভিক কথা লিখেনি, কখনও বক্তৃতা দেয় নি নিজের মহানুভবতা অবগত হয়ে। অথচ ঠিক সময়ে ভেতর থেকে উপচে উঠেছে তাদের অমূল্য সম্পদ, 'মন'। মানুষ হবার এই মৌলিক অথচ বর্তমানে মহামূল্য সম্পদটি যদি এমনি করেই সমস্ত মানবজাতির থাকতো!


------------------------------------------------------------
তথ্যসূত্রঃ "প্রথম আলো"তে করা কুররাতুল-আইন-তাহমিনা'র রিপোর্ট।

Tuesday, November 20, 2007

"মাঝরাতে ডুবেছে মাতাল..."

শিবু,
কি করিস? শুয়ে শুয়ে সঞ্জীবের গান শুনছি...
ঘুম আসে না...
কেমন যেন নির্লিপ্ত কষ্ট ঘিরে থাকে...
শূণ্য...ঝাপসা অনুভূতি...
এক মুহুর্তে সব কেমন করে শেষ হয়ে যায় দেখেছিস ?
বলেছিলাম না--মানুষের জীবন আর ক'টা দিন বেঁচে থাকা কি আশ্চর্য অর্থহীন !

Monday, November 19, 2007

"কার ছবি নেই। কেউ কি ছিলো?"


গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছে কষ্ট...
সঞ্জীব চৌধুরী, আমাদের সঞ্জীব চৌধুরী...
কিছু লিখতেও পারছি না...
কোমা থেকে মিরাকলের মত জেগে উঠে আবার গেয়ে উঠবেন, "আমি ফিরে পেতে চাই সেই বৃষ্টিভেজা সুর/ আমি ফিরে পেতে চাই সাত সুখের সমুদ্দুর"...এই সব আশা আমাদের মিথ্যে হলো...


আর কিছুই বলার রইলো না।

Sunday, November 18, 2007

ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং তারপর আমাদের দেশ

দেশটা কেন যেন স্বস্তি পায় না কখনই। যুদ্ধ করে অনেক ত্যাগে স্বাধীন হলো, এখন সেই স্বাধীনতা রক্ষা নিয়ে করতে হচ্ছে নতুন যুদ্ধ। দুর্নীতি যখন দেশের দরিদ্র মানুষদের আরো দরিদ্র করে দিচ্ছে, তখন তাদের পুরোপুরি নিঃসহায় করে দিতে উপাদান যোগাচ্ছে প্রকৃতি- বারবার। কখনও ভূমিধ্বস, কখনও প্রবল বন্যা, এবার প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়- সিডর!

১৯৯১ সালের ১৯শে এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছাসের ভয়াবহ স্মৃতি আমরা কখনও ভুলব না। এবারের ঘূর্ণিঝড়কে তুলনা করা হচ্ছে তার সাথে। বরং কেবল উপকূলীয় নয় এবার আক্রান্ত হয়েছে দেশের আরো অনেক অঞ্চল। খুলনা বিভাগের বরিশাল, ঝালকাঠি, সাতক্ষীরা, বরগুনা, বাগেরহাট, মাদারীপুর, পিরোজপুর, দুবলার চর সব জায়গায় প্রায় সহস্রাধিক মানুষ মারা গেছে। পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে মাটির সাথে মিশে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। পাকা ধান ঝড়ের তান্ডবে মিশে গেছে ক্ষেতের সাথে। দেশের বিদ্যুৎ অবস্থা, টেলিযোগাযোগ পুরোপুরি বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। এই লেখাটি লিখেছিলাম, ঘূর্ণিঝড়ের খবর পাবার পরপর গতকাল। আজ খবর এসেছে আরো আরো আরো মৃত্যু আর লাশের...

হাজার হাজার মৃত্যু... যারা বেঁচে আছে তারা এখন কি নিয়ে বাঁচবে সর্বস্ব হারিয়ে? এখন পর্যন্ত জানা খবরে ৩ লাখ ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো ৫ লাখ ।

প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে করেই তবু বেঁচে থাকতে হয়েছে এদেশের মানুষকে বারবার। আবার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে সহায় হতে হবে দেশের সমস্ত মানুষকে। জানি না কেমন করে কাটানো যেতে পারে এই ভয়াবহ বিপদ। যারা মারা গেছে তাদেরকে আমরা বাঁচাতে পারিনি, কিন্তু যারা এখনও কোন মতে বেঁচে আছে তাদের জন্য কি আমরা কিছু করতে পারি না? নিজেদের যার যা সামর্থ আছে সেইটুকু দিয়েই কি আমরা দেশের মানুষের এই বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি না?

যারা দেশে আছেন, জানি তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ সেই ভরসা রাখি। আর যার প্রবাসী, তাদের উপায় নেই সশরীরে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। তাই প্রিয় সচলায়তন ব্লগের ব্লগার ইশতিয়াক রউফ-এর দেয়া পেপাল লিংকটি এখানে দিচ্ছি। প্রবাসী যারা পড়ছেন এই লেখাটি, তাদের সবাইকে অনুরোধ করছি এই লিংকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে।

http://www.bang.org.vt.edu/makhan.html

অথবা রেডক্রিসেন্টে সাহায্য পাঠানোর ঠিকানাটিও দিয়ে রাখছি এখানে।

Bangladesh Red Crescent Society
A/C No. 01-1336274-01
Standard Chartered Bank
Dhaka Bangladesh
SWIFT Code: SCBLBDDX

বন্যা, প্রবল বৃষ্টি, তারপর ঘূর্ণিঝড়...পাকা ফসল নিঃশেষ হয়ে গেলো। বাংলাদেশের কৃষক কাটিয়ে উঠুক এই মহাবিপদের দিন। সেই প্রার্থণা রইলো।

Saturday, November 10, 2007

যাও পাখি


যোগাযোগের গতিময়তা ধীরে ধীরে
কমে আসা শুরু করেছে।
আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা বাঁধনের সুতো
দূরত্বের টানে ঢিলে হয়ে এসেছে যদিও
একেবারে ছিঁড়ে যায় নি ,
অদৃশ্য কোন জেদী সূতোর
পাকানো গিঁটের কারনেই হয়তোবা...।

একদিন সেই জেদী সূতো এঁকে বেঁকে
পেঁচিয়ে কেমন ডানা হয়ে যায় -
ছোট দু'টি পা...দু'টি ঠোঁট...
ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা ভালোবাসা...
সে ফিসফিস করে আমায় বলে,
"বন্ধু, ভালো আছিস তো ?"

আমি বুকের ভেতর হেঁচকা টানের
ব্যথায় কুঁকড়ে উঠি সুখে।
আমার ঢিলেঢালা বাঁধন ফের পোক্ত হয়ে ওঠে।

Saturday, November 03, 2007

বিন্দুর ছেলে


একটা সিনেমা দেখলাম একটু আগে। "বিন্দুর ছেলে"। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে মুশফিকুর রহমান গুলজারের পরিচালনা। অভিনয়ে- মৌসুমী, দিতি, হুমায়ূন ফরিদী, ফেরদৌস প্রমুখ। সিনেমা কেমন লাগলো, কার অভিনয় কেমন হলো, এসব গভীরতর চিত্র সমালোচনার উদ্দেশ্যে অবশ্য এই লেখা শুরু করি নি। উদ্দেশ্য বরং একেবারেই ভিন্ন। এই মুভি দেখে আমার ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেলো যে, তাই ।

আমার স্কুল- বিন্দুবাসিনী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
আমরা তিন বোন। তিনজনই এই স্কুলেই পড়েছি। সবার বড় বোন যখন ক্লাস নাইন কি টেন, আমি তখন মাত্র ওয়ানে ভর্তি হলাম। তারও আগে মাঝে মাঝে আপুর সাথে এমনি এমনি যেতাম স্কুলে। বড় আপুর বান্ধবীরা সবাই ভীষন আদর করতো। সেই আদরের টানেই আমার আপুর সাথে যাওয়া।

বড় আপুর সময় স্কুলে মর্ণিং-ডে শিফট আলাদা ছিলো না। আপুদের ক্লাস শুরু হতো খুব সম্ভবত সকাল এগারোটার দিকে। আর শেষ হতো পাঁচটায়। টিফিন পিরিয়ডে ওরা খুবই মজা করতো। কয়েকটা আপুর কথা বেশি মনে পড়ে, বড় শম্পা আপু, ছোট শম্পা আপু, খনা আপু, লাবণ্য আপু, মণি আপু... এরকম আরো অনেকেই। ওরা টিফিন পিরিয়ডে নানা রকম শয়তানী করতো। টীচারদের নকল করা তো সব পোলাপানেরই কমন অভ্যাস, সেসব। তারপর বিভিন্ন কমেডি নাটক বানিয়ে অভিনয় করা, কৌতুক বলা...আবছাভাবে এইসবই মনে পড়ে। ক্লাস টেনকে আমার তখন খুব বিশেষ একটা কিছু মনে হতো। মনে হতো, ওরা কত বড়, কত স্মার্ট! আমি কবে ক্লাস টেনে উঠবো?!

আমার বড় আপুনির নাম শারমীন জাহান শাম্মী/শিমুল। এই স্ল্যাশ-এর রহস্য হচ্ছে, আম্মু ডাকতো শাম্মী আর বাবা ডাকতো শিমুল। পরে শাম্মীটাই চালু হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু বড় আপুর বেশি পছন্দ ছিলো শিমুল নামটাই। এটা হারিয়ে না যায় এজন্যে ও কোথাও নাম লিখলে এভাবে দুইটাই লিখতো। তো আমার এই আপুনীর গ্রুপের দুষ্টু এবং দুষ্টু মাত্রই অবধারিতভাবেই ট্যালেন্টেড মেয়েরা মিলে স্কুলের প্রোগ্রামে নাটক করবে ঠিক করলো। ওই সময় ওদের পড়ার তালিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর শরৎচন্দ্রই বেশি স্থান নিয়েছিলো বোধ করি। যদিও বড় আপু ব্যক্তিগতভাবে সত্যজিৎ রায় এবং তাঁর ফেলুদা'র বিশেষ ভক্ত ছিলো। আর ওর পড়ার টেবিলে "ড্রাকুলা" নামের একটা বই থাকার ভয়ে ওই টেবিলের আশেপাশ দিয়েই যেতাম না মনে আছে। পড়তো "মাসুদ রানা"ও। কিন্তু নাটক বানানোর জন্য এগুলোর চাইতে চিরকালীন জনপ্রিয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেই ওরা বেছে নিয়েছিলো।

শরৎবাবুর "বিন্দুর ছেলে"ই কেন ওরা মঞ্চস্থ করবে বলে ঠিক করেছিলো তার কারন আমাকে না বললেও আন্দাজ করতে পারি। আমাদের স্কুলের নাম বিন্দুবাসিনী। আর এই গলের মূল চরিত্রের নামও বিন্দুবাসিনী। এই হয়তো কারণ। দু'টো প্রধান চরিত্র হচ্ছে "বিন্দু" এবং তার ভাসুরের বৌ। এই দু'টো চরিত্রের জন্য স্কুলের সবচেয়ে সেরা দুই সুন্দরী আপুকে নির্বাচিত করা হলো। এর মধ্যে বিন্দু হলো বড় শম্পা আপু এবং বড় বৌ হলো লুবনা আপু। এই দু'জনের মধ্যে বড় শম্পা আপু শুধু আমাদের স্কুলেই নয় বরং পুরো টাংগাইলের ছেলেদেরই হৃদয় কাঁপানো সুন্দরী ছিলেন, এটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। তখনকার সময়ে কাউকে বেশি সুন্দরী বুঝাতে হলে আমরা উদাহরণ দিতাম যে শ্রীদেবী'র মত সুন্দর! কিন্তু শম্পা আপু দেখতে আক্ষরিক অর্থেই শ্রীদেবীর মত ছিলেন। লুবনা আপুও অনেক সুন্দর ছিলেন।

তো এই দুই সুন্দরীকে দুই মূল ভূমিকায় রেখে তৈরি করা নাটকটা কেমন হয়েছিলো, কে কেমন করেছিলো বিশদ বলতে পারলে ভালো হতো নিশ্চয়ই কিন্তু দূর্ভাগ্য, স্মৃতি আর টানতে পারছে না। কিন্তু ভালো লাগার অনুভূতিটা স্পষ্ট মনে গেঁথে আছে। ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে দুই মা'য়ের দ্বন্দ দেখে সেই ছোট্ট আমার চোখে জল এসেছিলো তাও মনে পড়ে। তাই এতগুলো বছর পরে (কমপক্ষে ১৮/১৯ বছর) "বিন্দুর ছেলে" নিয়ে সিনেমা হয়েছে জেনে উৎসাহ নিয়ে দেখতে বসে গেলাম। সিনেমা ভালো-মন্দ যাই হোক (মন্দ নয়), আমার সেই ভীষন শৈশবকালকে একটুক্ষনের জন্য হলেও ফিরিয়ে নিয়ে এলো তো। এই বা কম কি?

Friday, October 26, 2007

এমনও শুনতে হয় !

"দেশে কোন স্বাধীনতাবিরোধী কখনও ছিলো না, এখনও নেই" -- বলেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ।

আফসোস।
এই আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। যেখানে "জামায়াতে ইসলামী"ও একটি বিশিষ্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে এখন পরিচিতি পায়। অথচ এই দলটিই একাত্তরে "বাংলাদেশ" নামটিতেই বিশ্বাস করতো না। বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই এই দেশের ভ্রূণ নষ্ট করে ফেলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলো যারা, এমনকি জন্মের পর যেন সেই শিশু দেশটি পূর্ণ বিকশিত হয়ে গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলেছিলো যারা -- তাদের সম্মিলিত দল জামায়াতে ইসলামী এখন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে নির্লজ্জ ধৃষ্টতায় নিজেদের দেশপ্রেমিক হিসেবে পরিচয় দেয়।

ধর্মভিত্তিক এই দলটি বোধহয় দেশটিকেও ইদানিং একটা ধর্মগোত্র ভেবে বসেছে। তাই নিজেদের খেয়াল-খুশিমত "ফতোয়া" দেয় দেশের ইতিহাস নিয়ে। সর্বশেষ সংযোজন উপরের বক্তব্যটি। আমার অবাক লাগে, এই মুজাহিদ, যে নিজের ১৯৭১ সালে আলবদর বাহিনীর ঢাকা শাখার প্রধান ছিলো, সে কি করে বলে সে নিজেই যুদ্ধাপরাধী নয়?!

ধিক্কার দেই এইসব নির্লজ্জ, সুবিধাবাদী, রাজাকার, আলবদরদের। তাদের এইসব নির্লজ্জ মিথ্যা ফতোয়ায় বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতার ইতিহাসের কিছু যাবে আসবে না। এদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের কথা থেকে জানতে পারলাম, ১৯৭১ সালের জামায়াত সমর্থিত পত্রিকা "দৈনিক সংগ্রাম"-এর নয় মাসের সংখ্যা পড়লেই খুব স্পষ্টভাবে তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধী ভূমিকা জানা যায়, জানা যায় কেমন করে তারা গণহত্যা এবং নারী নির্যাতনে পাকিস্তানী বাহিনীকে সাহায্য করেছে নিজেরা শান্তিকমিটি গঠন করে, কিভাবে তারা তালিকা প্রস্তুত করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসংগে শাহরিয়ার কবির আরো বলেছেন, "১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবার জন্যে যে দালাল আইন প্রণয়ন করা হয়েছিলো, সেখানে পরিষ্কার সংগা দেয়া হয়েছিলো কাদের বিচার করা হবে। এবং সেই আইন অনুযায়ী কিন্তু জামায়াতের প্রধান গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিলো যুদ্ধাপরাধের দায়ে। এবং জামায়াতের অনেক নেতাকে তখন গ্রেফতার করা হয়েছিলো, অনেকে পাকিস্তান পালিয়ে গিয়েছিলো।" এতসব পরিষ্কার প্রমান থাকা সত্ত্বেও যারা বলে, বাংলাদেশের কখনও যুদ্ধাপরাধী ছিলো না, তাদের কথা শুনে বোধহয় দুঃখ না পেয়ে আমাদের হা-হা করে অট্টহাসি হাসা উচিৎ।

যুদ্ধাপরাধীর আন্তর্জাতিক সংগা অনুযায়ী যেসব সৈনিক যুদ্ধে অপরাধ করেছে শুধু তারাই নয় বরং যেসব সিভিলিয়ান তাদের সাহায্য করেছে তারাও যুদ্ধাপরাধী। এবং যেকোন সংগাতেই জামাতের শীর্ষনেতারা সেই সময়ের যুদ্ধাপরাধী। যুদ্ধাপরাধী বিচারের আইন সম্পর্কে তাঁর কথা থেকে জানতে পারি, ১৯৭৩ সালে আমাদের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ এবং বিচারের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে যে সংবিধান এখনও বাংলাদেশে বলবৎ। কাজেই এখনও সরকার চাইলে সাংবিধানিকভাবে বিচার করতে পারে। এমনকি সামরিক ট্রাইব্যুনালেও বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব, যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের করা হয়েছিলো।

যুদ্ধাপরধীদের বিচারের সব পথ খোলা আছে, শুধু প্রয়োজন সরকার অথবা সেনাবাহিনীর সদিচ্ছার। যেকোন উপায়ে হোক, আমরা চাই - যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক।

Tuesday, October 23, 2007

আমার জানলা দিয়ে


"আমার জানলা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়,
একটু বর্ষা, একটু গ্রীষ্ম, একটুখানি শীত।
সেই একটুখানি চৌকো ছবি আঁকড়ে ধরে রাখি,
আমার জানলা দিয়ে আমার পৃথিবী...।"

যখন দেশ ছেড়ে আসি, জুন-জুলাইয়ের তুমুল গরম তখন দেশে। আর মেলবোর্ণে পা রাখার পর কনকনে ঠান্ডা বাতাসই যেন বরণ করে নিলো আমাকে। ঠিক দুই মেরুর আবহাওয়াওয়ার বৈপরিত্য। সব কিছুই আমার কাছে খুব বেশি নতুন ছিলো, এখনও। নতুন দেশ, নতুন সংসার (যে সংসারে আমিই কিনা কর্ত্রী!), নতুন বাসা, সেই বাসা নতুন করে গোছানো, সংসারের টুকিটাকি অজস্র নতুন জিনিসপাতি...কত কি নতুনের মাঝে নতুন এক আমি। আমার প্রিয় সংগীটিও এখন নতুন এক ভূমিকায়, সেই ফার্স্ট ইয়ারের ক্যাম্পাস চষে বেড়ানো তারেক-তিথি এখন তিরিং-বিরিং বন্ধুই শুধু নয়, বর-বৌ ও বটে। হি হি , ভাবতেই ফিক করে হাসি চলে আসে মুখে!

এতসব নতুনের মাঝে আমার ভূমিকাগুলো মাঝে মাঝেই অবাক করে দিচ্ছে আমাকে। আমি রান্ধি-বাড়ি, এটা আমার মাঝে মাঝে নিজেরই ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। তবু হয়ে যাচ্ছে সব ঠিকঠাকই আসলে। কেমন এক ধরনের চ্যালেঞ্জিং যেন সব। আস্তে আস্তে দেখি, আজীবন যেই ভূমিকায় আমি সবচেয়ে অদক্ষ ছিলাম, সেই রাঁধুনীর ভূমিকার আমি রীতিমতো এক্সপার্ট হয়ে যাচ্ছি। এক সময় মা'র রান্নাঘরের দরজায় উঁকি মেরে চলে আসতাম, এখন নিজের ছোট্ট কিচেনটাকে অনেক আপন মনে হয়। আমি ঠিক গোছানো লক্ষী মেয়ে নই কখনই, বরং অনেক বেশি অগোছালো করে ফেলে রাখার অভ্যাস সব কিছু। তবু রান্নার হরেক রঙের মশলাগুলোকে জলরঙের গুঁড়ো ভেবে আলাদা আলাদা কৌটোয় সাজিয়ে রাখি সুন্দর করে।

কিচেনের ঠিক পাশেই একটা জানালা। রান্না চড়িয়ে মাঝে মাঝেই তাকিয়ে থাকি জানালার ফাঁক দিয়ে। বাম পাশ দিয়ে রাস্তা আর অনেক বাড়িঘর দেখা যায়। বাড়িগুলো সুন্দর, ছিমছাম। আমরা ঠিক শহরে থাকি না বোধহয়, এটাকে বরং উপশহর বলা যেতে পারে। তাই হয়তো মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিংয়ের চাইতে এই ছোট ছোট আপন-আপন বাড়িগুলোই বেশি চোখে পড়ে। আর জানালা দিয়ে ডান দিকে চোখে পড়ে একটা ছোটমোট পার্ক-বাচ্চাদের। আর জানালার ঠিক সামনেই একটা গাছ, অনেক ডালপালা ছড়ানো। যখন আমি প্রথম এই বাসায় উঠেছি, সেই ডালপালাগুলো খুব একলা ছিলো, একটা সবুজ পাতাও দেখিনি আমি। তীব্র শীতের প্রবল ছাপ গাছটা জুড়ে- কেবল ফ্যাকাসে, ধুসর রঙে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে ছিলো যেন আমার রান্নাঘরের সংগীটি।

আজ অনেক দিন পরে আমার সংগী গাছটি মন খুলে হাসছে। শীত কমে গেছে, রোদ উঠেছে দারুণ। আর সেই খুশিতে সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে গাছটার মরা ডালপালা। বড় ভালো লাগলো দেখে। সবুজের দেশের মানুষ আমরা, এই ভিন দেশের মলিন গাছগুলোকে দেখে বড় মায়া হতো। আজ ওদের খুশিতে আমারও মন খুশি। ক্যামেরার ছোট্ট গোল বাটনে তর্জনীর একটা টিপ পড়ে তাই - ক্লিক!

Sunday, October 21, 2007

ঢাম ঢাম পূজোর স্মৃতি



আমার কিচেনের সিংকের কলটা ঠিকমত বন্ধ হয় না কিছুতেই। পানি পড়তেই থাকে একটানা। খুব জোরে চেপে বন্ধ করার আগে পর্যন্ত নিজস্ব একটা ছন্দে পানি পড়তে থাকে। হঠাৎই এক সময় খেয়াল হলো যে এই শব্দটা ঠিক টিপটিপ নয়। কেমন যেন বরং "ঢাম ঢাম"। একটু খেয়াল করে শুনতেই দেখি কেমন যেন উৎসব উৎসব লাগছে। বুঝলাম কেন শুনছি এতক্ষন ধরে। শব্দটা আসলে ঠিক পূজোর ঢাকের মত!

ক্রমাগত পানি পড়ার শব্দের বিরক্তি কেটে গেছে আমার সেদিন থেকেই। এখন যত শুনি কেবল দেশের কথা মনে হয়, মনে হয় পূজোর কথা। ছেলেবেলায় পূজোর উৎসব আর প্রতিমার দেখার তীব্র আগ্রহ থেকে শুরু করে এই মাত্র ক'দিন আগের ইউনিভার্সিটির উৎসবমুখর ক্যাম্পাস, সব কিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

ছেলেবেলায় কি ভীষন আকর্ষন ছিলো প্রতিমা দেখার! অত ছোট বয়সে ধর্ম কিছু বুঝতাম না। যেখানে সবাই আনন্দ করতো সেখানেই ছিলো যত আকর্ষন। কাজেই পূজো শুরু হলো তো প্রতিমা দেখতে যেতেই হবে। বিকালবেলা সুন্দর কোন ফ্রক পড়ে আমি রেডি। আম্মু হাসতে হাসতে চুলে পরিপাটি দুইটা বেনী করে চোখে টানা কাজল দিয়ে দিতো। আমি আমার ছোট আপুর (মেজো বোন) হাত ধরে বেরুতাম প্রতিমা দেখতে। আমাদের ভীষন প্রিয় সেই ছোট্ট মফস্বল শহর টাংগাইল। ছোট কিন্তু খুব ছিমছাম একটা শহর আমাদের টাংগাইল। আমরা তখন থাকতাম আকুর টাকুর পাড়ায়। আমাদের বাসার আশেপাশ দিয়ে কত গলি-ঘুপচি। অনেক হিন্দু-বাড়ি ছিলো ওখানটায়। যেখানেই ঢোলের শব্দ, সেখানেই ঢুকে গিয়ে দেখতেই হবে আমাদের। প্রতিটা বাড়িতে ছোট পরিসরে নিজেদের প্রতিমা-পূজো হতো। একটা বাড়ি - ওদের একটা আলাদা ঘর ছিলো, আর সেই ঘরের পুরোটা জুড়ে আলাদা আলাদা তাকে অনেক অনেক খুব ছোট ছোট প্রতিমা সাজানো থাকতো। আরও অনেক নকশা করা ছিলো দেয়াল জুড়ে। প্রতি বছর এই বাড়িটাই থাকতো আমার প্রধান টার্গেট। তখন বুঝি নি, এখন স্মৃতি থেকে মনে হয় যে সম্ভবত ওগুলো টেরাকোটার মত ছিলো। একবার ভীড়ের কারনে আমার চার বছরের ছোট্ট শরীর ওই বাড়িতে ঢুকতে পারলো না, এত মন খারাপ হলো।

নিজেদের পাড়ার সব ছোট ছোট পূজা-মন্ডপ দেখা শেষ হলে আমরা বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করতাম সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে ফেরার। তখন বাসার সবাই মিলে যাবো বড় কালীবাড়ির সবচেয়ে বড় পূজা-মন্ডপ দেখতে। এক রিকশায় আম্মু, আর বাবার কোলে আমি, আরেক রিকশায় ছোট আপু-বড় আপু। পাঁচজন মিলে ভীড় ঠেলে প্রতিমা দেখে মেলা ঘুরে টুরে বাড়ি ফিরতাম আরো রাতে।

আরেকটু বড় হতে হতে মা-ও বড় হয়ে গেলো, তখন আর আমাদের সাথে মা যেতো না। মফস্বল শহরে আপুরাও বড় না হতেই বড় হয়ে গেলো অনেকখানি, কেবল আমি বাসায় সবার ছোট বলে আজীবন ছোটই রয়ে গেলাম। তাই প্রতি বছর পূজোয় আমার মেলায় যেতেই হবে, যেতেই হবে প্রতিমা দেখতে। বাবার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান, জেদ করে করে অবশেষে চলে যেতাম দুজন মিলে। আরো কিছু বড় হলে পরে মেলায় ঘুরতাম বন্ধুরা মিলে, মাসীমাদের আদরের হাতের মোয়া-মিষ্টি খাওয়ার আশায় জুড়ে বসতাম তাদের খাটের ওপর সারাদিন ধরে।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় পূজার সার্বজনীন উৎসবের স্বরূপটা দেখলাম সবচেয়ে ভালো করে। আমি থাকতাম রোকেয়া হলে, ঠিক পাশেই জগন্নাথ হল। কি মহা ধুমধাম করে যে পূজা পালন হতো সেখানে। প্রায় সমস্ত ডিপার্টমেন্ট পূজা-মন্ডপ সাজাতো জগন্নাথ হলে (ইসলামিয়াত এবং আরবী ছাড়া :) )। সব ধর্ম নির্বিশেষে উৎসব কেমন করে পালন করতে হয় তার একটা দারুন উদাহরণ আমি দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুজার অনুষ্ঠানগুলোতে। স্বরসতি পূজার দিনে আমি খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে যেতাম নিজেদের হলের পূজা-পালন দেখার জন্য। সবার ছবি তুলে দিতাম আমি। কেমন করে জজ্ঞ করা হয় দেখলাম তখনই প্রথম। আর বিকালবেলা শাড়ি পড়ে, বড় লাল টিপ আর কখনও কখনও সিঁদুরে সিঁথি রাঙিয়ে ঘুরে বেড়াতাম বন্ধুরা সবাই মিলে। মেয়েদের হলের মাঠের একটা অংশ পর্যন্ত ছেলেরা ঢুকতে পারতো পূজোর দিনে। তার একটা বিশেষ আকর্ষন থাকতো তাদের। :) পরের দিন ক্যাম্পাসে দেখা হলে বেশ ভাব নিয়ে কোন ছেলে বন্ধুর মুখ থেকে শুনতাম, "কাল তো তোমাদের হলে ঢুকেছিলাম"!

ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীনই প্রথম মা-কে না বলে এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। সময়টা ছিলো পূজার। সেই বন্ধুর আরেক বন্ধুর বাড়ি বসে গল্প করছি, এমন সময় ঠিক পাশেরই পূজা মন্ডপ থেকে তুমুল ঢাকের শব্দে আমার আর প্রিয় বন্ধু শিবার মাথা খারাপের অবস্থা, খালি নাচতে ইচ্ছা করছিলো। পরে আন্টিকে কি একটা বলে ছুতো দিয়ে বারান্দার পাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমার আর শিবার সে কি নাচ!

এখনও পূজা। এখন কোথাও থেকে তুমুল ঢাকের শব্দ শোনা যায় না। তবু এই বিভুঁইয়ে সিংকের কলকে ঢোলের শব্দ ভেবে মস্কিষ্কে আশ্চর্য আলোড়ন ওঠে আমার। স্মৃতির সময় যন্ত্রে চড়ে আমি পাড়ি দেই বহু পুরনো দিনের পথ। ছুঁয়ে আসি অনেকগুলো মমতাময়ী, বিশ্বস্ত হাত- মা'র, বাবার, আমার দুটি সোনা আপুর, আমার পরমপ্রিয় বন্ধুদের।

Friday, October 19, 2007

স্মৃতির নৌকা বেয়ে


বিকেলবেলাটায় বেশ ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায় বারান্দায় বসলে। গ্রীলের ওপাশে চোখ পেতে দোদুলকে দেখি আমি মুগ্ধ হয়ে। মাঠ নেই খেলার, তবু ভাগ্যিস আবাসিক এলাকা বলে বাসার সামনে এইটুকুনি রাস্তাটা পেয়েছে, যেখানে বড় যান চলে না। সেই সেইটুকুনি রাস্তাতেই কয়েকটা ইট একটার ওপর একটা সাজিয়ে উইকেট বানিয়ে ব্যাটসম্যান সেজে দাঁড়িয়ে গেছে তার সামনে। ২২ গজের তত্ত্ব এইটুকু জায়গায় ওরা মানতে পারে না, তাতে কি? অদূরে দাঁড়িয়েই হুংকার ছাড়ে ভবিস্যৎ মাশরাফি।

আমি মুগ্ধ হয়ে ওদের দেখি। চারপাশের যেসব ক্ষুদে ফিল্ডার ছুটোছুটি করছে ওদের দেখি। উইকেটের পেছনের দুধভাত ছেলেটাকেও দেখি। দেখতে দেখতেই কানের ওপরে চাপড় পড়ে। চমকে ওঠে তাকাতেই দেখি ফজলু আর নুরু দাঁড়িয়ে ফ্যাকফ্যাক করে হাসছে। ঠিক বুঝতে পারি না কেন, কিন্তু আমার একটু খটকা লাগে। ভ্যাবলার মত তাকিয়ে থাকি আমি। আবার চাপড়।

- ব্যাটা,আমাদের দিকে তাকাইয়া দেখতাছোস কি? আকাশ দ্যাখ, ক্যামন ম্যাঘ করসে দেখছস? এক্ষনি নৌকা নিয়া বাইর হব। উঠ উঠ, সারাদিন বই পইড়া পইড়া ভ্যাবলা ভাবুক হইছস একটা।

এবার আমার সম্বিত ফিরে, তাই তো ! আজ দুপুরেও না ইস্কুল থেকে ফেরার পরে এমন কথাই হয়েছিলো? এর মাঝেই ভুলে গেলাম? ফজলু, নুরু এবার হাত ধরে টান মেরে উঠিয়েই ফেলে আমাকে। বাংলা ঘর পেরিয়ে উঠোনে বসে থাকা মা'কে চিৎকার করে একটুখানি জানিয়ে যাই কেবল, "মা রে, আমি গেলাম , চিন্তা করিস না"...।

এবার ছুটতে থাকি তিন বন্ধু মিলে। নদীর ঘাটে নৌকো বাঁধাই ছিলো। নুরু আমাদের তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে ভালো পারে এইসব কাজ। আমি আর ফজলু একটু পরে দেখি নৌকা ভাসছে! আহা! চলতে থাকে আমাদের নৌকা... পারি না বলে কিছু নেই, তিনজনেই বৈঠা হাতে নেই পালা করে। আকাশের মেঘ একটু একটু করে বাড়তে থাকে, গুমগুম গুড়গুড় হাঁকডাক। এত জোরেলা বাতাস! আহা! পাড়ের বাড়িঘরের সামনে দাঁড়ানো কত্ত মানুষ, ছেলে, বুড়ো, বৌঝি, তাদের কচি কচি ননদেরা...!

- সবাই বুঝি আমাদেরই দেখতাসে রে নুরু?
- আররে না...অতদূর থেইকা অত বুঝা যায় নাকি রে? ওরা ম্যাঘ দেখে রে ম্যাঘ, বাতাস খায়!

একটু একটু দূরে সরে যেতে থাকে পাড়ের ছবি...আমাদের ছোট তরী বেয়ে আমরা দূরে, আরো দূরে ভাসতে থাকি। ফজলু হঠাৎ নৌকার মাঝে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত শূণ্যে তুলে চিৎকার করতে থাকে। "ওরে ফজলা, হাসু...আমি তো উইড়া যাইতেসি রে...আআআআআআআআ"। বাতাস বাড়তে থাকে আমাদের আনন্দ আরো বাড়িয়ে দিতে। আমিও দাঁড়াই নুরুর পাশে, আমিও চিতকার করি। "উউউউউউউউউউউউউউ, হুইইইইইইইই"। দুইজন গলা জড়াজড়ি করে আমরা নৌকার ওপরে নাচতে থাকি দুলে দুলে। ফজলু বৈঠা হাতে দাঁত কেলিয়ে হাসে। "খাড়া...আমিও আই"।

একজন একজন করে হাল ধরি। তুমুল হাসি, হুল্লোড়ের সাথে বেড়ে চলে পাগলা হাওয়া। নৌকা চলে, চলতে থাকে। নৌকা চলে, হাওয়া চলে...নৌকা চলে, হাওয়া চলে ! কৈশোরের উদ্দামতায় আনাড়ীপনাকে তুচ্ছ করে চালানো নৌকাও এবার একটু হাসে আমাদের সাথে, "দাঁড়া রে দাঁড়া। এবার আমার খেল দ্যাখ"। অতঃপর নৌকার গতি আর বাতাসের বেগ পাল্লা দিয়ে উল্লাস করে। এক সময় দেখি গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছি। কৈশোরের পাগলা যৌবন টেনে নিয়ে এসেছে আমাদের এত দূরে, এবার হানা দেয় ভয় কৈশোরের আরেক রূপ- ভয় পাওয়া শৈশব।

নুরু, ফজলু এবং আমি একে অন্যের নাম ধরে কান্না শুরু করে দেই এবার। মা"র কথা মনে হয়। এই নৌকা ঠিক দিক মেনে মেনে কেমনে বেয়ে নিব আবার আমাদের গ্রাম? ও আল্লাহ বাঁচাও, এইবার শুধু বাড়ী ফিরতে দাও, আর কখনো এমন করুম না। আল্লাহ তুমি মেহেরবান, তুমি দয়ালু...কাইল থেইকাই নামাজ পড়মু...গ্রামে ফিরাইয়া নাও, বাড়ী ফিরাইয়া নাও।

আস্তে আস্তে বাতাস কমে আসে, নৌকাও কথা শোনে আমাদের। আল্লাহর নাম নিতে নিতে গ্রামের বাড়ীঘর চোখে পড়তে থাকে আবার একটু একটু করে। আপন ঘাটে নৌকা ভেড়াই আমরা।... এতক্ষনের উত্তেজনায় কাঁপছে শরীর। হঠাত সব রাগ গিয়ে পড়ে একজনের ওপর। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তাকেই গালি দিতে থাকি একমনে..."শয়তান আল্লাহ, খুব পাট নিলি আমাদের ওপরে না? তোরে যদি আর ডাকসি জীবনে"!।


- দাদু, আমি আজকে ৩৯ করেছি জানো?

দোদুলের ডাকে নেমে আসি আমার কৈশোরের নৌকো থেকে। আনমনে বলি,"আর আমি সেঞ্চুরি"!

Thursday, October 18, 2007

...অতঃপর !


... আসলে অজন্তার কোন অলটারনেটিভ ছিলো না। সুতরাং বাধ্য হয়েই...।

সমস্ত গন্ডগোলের মূলে ছিলো তার মা। আরে বাবা, মেয়েটা নাহয় ফড়িং হয়ে একটু বেশিই উড়ে বেড়াচ্ছিলো- তা উড়ুক না, এ তো ওড়ারই বয়স। তাই বলে তার পাখা কেটে ফেলার ষড়যন্ত্র ! এ বড্ড বাড়াবাড়ি। অজন্তা যে প্রতিদিন ইউনিভার্সিটি থেকে দেরীতে বাড়িতে ফিরতো সে তো আর এমনি এমনি নয়- কাজ আর ব্যস্ততার চাপে। কে না জানে ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে পড়া আনকোরা জীবনটা কত ব্যস্ততার! কাজের কি আর শেষ আছে- কার্জন হল ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য দেখতে দেখতেই তো কত সময় লেগে যায়।তার ওপর টি.এস.সি. তে "DU" এর পর A থেকে Z লাগিয়ে কত সংগঠন! সবগুলোর সদস্য না হলেই নয়। নতুন বন্ধুদের সাথে জম্পেস আড্ডাটাও কি কম ইম্পর্ট্যান্ট? এর মাঝে ক্যাম্পাসের আশেপাশের দর্শনীয় স্থানে ঘোরাঘুরি। এই সব কিছুর ফাঁকে কাস-প্র্যাকটিকাল তো করতেই হয় (যন্ত্রণা)। সুতরাং এতদিক রক্ষা করে অজন্তা যে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতো সে-ই ঢের। কিন্তু অজন্তার মা এসব বুঝলেন না। মেয়ের ওপর কড়া শাসনের ব্যর্থ চেষ্টা করে তিনি পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, বেয়াড়া মেয়েটাকে বিয়ে দিতে হবে।

অজন্তার মাথায় পুরো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। মাকে শত অনুনয় করেও লাভ হলো না। সামনে পুরো জীবন, ক্যারিয়ার, এনজয়মেন্ট--এর মাঝে বিয়ে নামের যন্ত্রণা! রক্ষে করো ঈশ্বর, অজন্তাকে বাঁচাও। ঈশ্বর শুনলেন, অজন্তাকে বাঁচানোর পথ বের করে দিলেন। হবু বর নামক শত্রুর সাথে কথা বলার সুযোগ পেলো সে। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় অজানা কণ্ঠের ফোন--সে-ই। সুযোগ পেয়েই নানান মিথ্যে অজুহাতে বিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা চালালো সে। পাত্র অনড়, অজন্তা যে সমস্যার কথাই বলে বিরক্তিকর রকমের ভদ্র বর বলে "It's ok,No prolem"। এরপর প্রতিদিন তাকে জ্বালাতে আসতে শুরু করলো ফোন। কোন উপায় না দেখে অজন্তা একদিন তাকে বলে বসলো, "আমার একজনে সাথে অ্যাফেয়ার আছে....", তখনও প্রতুত্তর "It's ok,তোমার বয়সে এটাই স্বাভাবিক। "No problem,বিয়ের পর আমি এসব মনে রাখবো না"-!!! প্রায় হাল ছেড়ে দিয়ে অজন্তা প্রতি রাতে আতংকে থাকে কখন যেন নির্লজ্জ, নাছোড়বান্দা লোকটার ফোন বেজে ওঠে। অবশেষে শেষ চেষ্টা হিসেবে অজন্তা একদিন তাকে সত্যি কথাই বলে। বলে তার স্বপ্নের কথা, তার পড়াশোনা, স্বাধীনভাবে ক্যাম্পাস-জীবন কাটানোর ইচ্ছা, একটা ব্রিলিয়ান্ট ক্যারিয়ার....। টেলিফোনের অপর প্রান্ত নি:শ্বব্দে সব শোনে, বুঝতে পারে একটা উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা...এবং অবশেষে ধীরে ধীরে ছোট্ট করে বলে "ok dear, তোমার স্বপ্নই সত্যি হোক, ভালো থেকো।"

অত:পর...। আতংকের সেই ফোনটা আর আসে ন। অজন্তা ভাবে বুঝি বাঁচা গেলো। বাঁচতে গিয়ে দ্যাখে কিসের অপেক্ষায় যেন সমস্ত দিন বড্ড ফাঁকা। প্রিয় ক্যাম্পাসের প্রিয় ব্যস্ততাগুলো অর্থহীন--রাত নামে, বাড়ে প্রতীক্ষা। নিজের অনুভবের হঠাৎ পরিবর্তনে হতবাক নিজেই সে ভাবতে থাকে "Is it really ok?"

এরপর একদিন চূড়ান্ত দ্বিধা আর ভয় নিয়ে ভীষন কাঁপা হাতে অজন্তা আঙুল ঘোরায় এক অনভ্যস্ত নম্বরে, পরিচিত কণ্ঠস্বরের আশায়...।

আসলে অজন্তার কোন অলটারনেটিভ ছিলো না। সুতরাং বাধ্য হয়েই...

Wednesday, October 17, 2007

হৃদয়পাত্র উচ্ছ্বলিয়া


একটানা বেজে চলা টেলিফোনটা ধরতে ইচ্ছা করছেনা কেন জানি। অলস সময়টা রোজকার মত আজ একঘেয়েও মনে হচ্ছে না, বরং সব বাদ দিয়ে অলসতাটাকেই আঁকড়ে বসে থাকতে ভালো লাগছে যেন। টেলিফোনের ওপাশে মেয়েটা নিশ্চয়ই চিন্তায় অধীর হচ্ছে, তা হোক না একদিন--রোজ সেই একই নিয়ম, অফিসে বসে দুপুরের খাবারের ফাঁকে মায়ের খোঁজ--আজ নাহয় সে একটু চিন্তায় পড়ুক।

আজ দিনটার শুরুই যে অন্য রকম, আজ ভাঙুক সব নিয়ম।

বারান্দার ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে আজ বহুদিন পরে বিকালটাকে বড় সুন্দর মনে হলো আমার। বিকালের নরম হলুদ আলো বুঝি সত্যি এত সুন্দর হয়! কতদিন আমি দেখিনি, কতদিন চোখ বুঝে ছিলাম, কত বছর?

পাশে রাখা সাদা খামটার দিকে চোখ পড়ে আবার। আজই সকালের ডাকে হাতে এলো। প্রাপকের নাম বরুণা। চমকে উঠেছিলাম, এই নামে আমাকে কেউ ডাকে না আজ কত বছর!

...তারপর...তীব্র আবেগে সংবরনহীন জলোচ্ছ্বাস। না, আজ আর কোন খেদ নেই, কোন অভিযোগ নেই আমার জীবনের কাছে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কি অপূর্ব উপহার, কি শান্তি! পূর্ণতা।

আজ সেই চিঠি এলো, যার প্রতিক্ষায় দিন গুনেছি আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে। যে কথার শুণ্যতায় এত বছরের পূর্ণ সংসারে সব থেকেও কিসের এক অপূর্ণতা ঘিরে ছিলো আমাকে--আজ তা-ই রঙীণ ঘুড়ির মত উড়ে উড়ে আমার দরজায় আটকা পড়েছে...আর কি চাইবার থাকলো আমার জীবনের কাছে?

"বরুণা,
খুব চমকে গেছো বুঝি আজ এতদিন পরে আমার চিঠি পেয়ে! অথবা উলটোটাও হতে পারে, হয়তো বিরক্ত, কিছুটা বিব্রত। কিন্তু এতটা বয়সে, এত দিন পরে তোমাকে লিখতে গিয়ে আমার কিন্তু চমক, বিরক্তি বা বিব্রতবোধ--এর একটাও হচ্ছে না।

দেশে গিয়েছিলাম গত বছর, কি আশ্চর্য অঞ্জনের মৃত্যুর খবর আমি সেবার মাত্র পেলাম জানো? তখনই তোমাকে লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কি এক অস্বস্তি, যা এতগুলো বছরে তোমার থেকে আমাকে দূরে রেখেছিলো -- আবারো আমাকে আটকে দিলো। থাক সে কথা। তোমার মেয়ে কেমন আছে? অনেক বড় হয়েছে নিশ্চয়ই? তোমার মত মুখ আর অঞ্জনের মাথা পেয়েছে শুনলাম নীলার কাছে।

আমার ছেলেমেয়ে দুটোও খুব ভালো, আমার মত নয়, নীলারই মত- ভাগ্যিস, আমার মত হলে নীলাকে একসাথে তিনটা পাগল সামলাতে হোত!

বরুণা, আজকাল শরীর ভালো থাকে না জানো? বয়স ধরে ফেললো বুঝি আমাকেও। সব সময়ের হাসিখুশি থাকা এই আমি মাঝে মাঝেই বড্ড আনমনা হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যাই। অতীত মনে পড়ে কেবল। মনে পড়ে দেশের কথা, আমার মফস্বলের শান্তিমাখা কৈশোর, প্রথম যৌবনের ইউনিভার্সিটি জীবন, প্রথম চাকরী স-ব। আর মনে পড়ে খুব ছোট্ট একটা সময়ে বিদ্যুতের মত আমার জীবন ঝলকে দেয়া তোমার কথা! বয়স বাড়লে বুঝি এমনই হয়? যা কিছু চলে গেছে তার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে কেবল বারবার? তোমারও কি তাই হয় বরুণা?!

কত কিছু বলছি কেবল, থাক আজ। তুমি ভালো থেকো, ঠিক তোমার নিজের মত করে।

ইতি,
অরুনাভ।

পুনশ্চ: কেন আমি এমন হয়েছি বল তো? যে কথা বলব বলে আজ এত দিন পরে তোমাকে লিখতে বসেছি, এখনও তাই বলা হলো না! বরুণা, সেদিন তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে অনেক কষ্ট দিয়েছিলাম জানি। কিন্তু আজ জীবনের এতটা পথ পাড়ি দিয়ে যে কথা বলা অর্থহীন, তাই খুব বলতে ইচ্ছা করছে... বরুণা--তুমি জানো না, আমিই জানতে দিই নি, আজ বলছি, তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।

-------------------------------------------------------
ইন্সপায়ার্ড বাই গি দ্য মোঁপাসা।

Tuesday, October 16, 2007

রাঙ দে বাসান্তি - এখন যৌবন যার


"রাঙ দে বাসান্তি"। কিছুদিন আগে দেখা এই মুভিটা খুব বেশী মাথার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে কদিন ধরে...নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে অনেক পুরনো ভাবনা,তাই মনের তাগিদ থেকেই এই লিখা।

দিল্লী ইউনিভার্সিটির এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী , তাদের বন্ধুত্ব , আধুনিক জীবন-যাপন আর হঠাৎ বদলে যাওয়া আদর্শ-এই নিয়ে এগিয়ে গেছে "রাঙ দে বাসান্তি" মুভির কাহিনী।

কারান,আসলাম,সুখী,ডিজে,সোনিয়া চমৎকার একটি বন্ধুদল। বন্ধুত্বের উচ্ছ্বলতায় কেটে যাওয়া দিনের মাঝে হঠাৎ করেই বিদেশ থেকে এলো "সু" নামের একটি মেয়ে। উদ্দেশ্য ভগৎ সিং-এর উপরে একটি ডকুমেন্টারি বানানো। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দু"শ বছর পরে দেশপ্রম যে কতখানি আজব অন্তসারহীন একটা "টার্ম "-এ পরিণত হয়েছে এই প্রজন্মের কাছে ওদের কথাবার্তায় তা স্পষ্ট। পপুলেশান,করাপশান-এই বেপারগুলোয় উর্দ্ধগতি ছাড়া দেশকে নিয়ে গর্ব (!) করার মত আর কিছুই তারা খুঁজে পায় না ! অথচ লিজেন্ড হয়ে ভগৎ সিং টিকে আছে সেই বৃটিশ মেয়েটির কাছে যার পিতামহ স্বয়ং বৃটিশ সরকারের প্রতিনিধি হয়ে তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন চাকরীর খাতিরে আর ক্রমাগত অনুশোচনায় পুড়ে তার অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন ডায়েরীতে ।

এই ডকুমেন্টারীতে অভিনয় করতে করতেই এই অতি আধুনিক,নিজস্ব সংস্কৃতি প্রায় ভুলতে বসা তরুণদের মধ্যে জেগে ওঠে এতদিন মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা দেশপ্রেম।তা আরো প্রয়োগিক হয় নিজেদের বন্ধুর ( যে মিগ 21-এর পাইলট) বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরে। দু'শ বছর আগের শহীদদের কাছ থেকে পাওয়া দেশপ্রেমের দীক্ষা নতুন করে সঞ্চারিত হয় তাদের মাঝে, শুরু হয় নতুন প্রজন্মের আন্দোলন- শাসকের বিরুদ্ধে, পার্থক্য কেবল তখন শাসক ছিলো ভিনদেশী আর এখন নিজেদের স্বাধীন দেশের নিজেদের নির্বাচিত সরকার।

সিনেমাটি দেখতে দেখতে আমি নির্বাক হয়ে যাই। অনেকটা সময় কেটে যায় তেমন করেই....ভেতর থেকে কিছু একটা করার তাগিদ ঠেলে বের হয়ে আসে। এরকম হাজারটা অন্যায়, দূর্ণীতি রোজ আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে আর দেয়ালে পিঠ ঠেকে রুখে দাঁড়ানোর বদলে সব আমাদের গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে। সত্যি কি কিছুই করার নেই আমাদের? নিজের দিকে তাকাই, নিজে কি কখনও কিছু করতে পেরেছি?

না পারিনি...কিছুই পারিনি। একটু কেবল চেষ্টা করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলগুলোতে যোগ দিয়ে নিজের বোধের দায় মেটাতে। শামসুন্নাহার হলের ছাত্রী নির্যাতনের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনের কথা মনে পড়লে এখনও আশাবাদী মনে হয় নিজেকে, কেমন করে অতি সাধারণ কিছু ছাত্র-ছাত্রী এক মুহুর্তে গর্জে উঠেছিলো প্রতিবাদে।

এই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে আপাতদৃষ্টিতে কেবল ফ্যাশনপ্রিয় বাস্তবতাবর্জিত আত্মকেন্দ্রিক বলে মনে হতে পারে , কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তাদের চোখটা হয়তো কোন কোন ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে আছে, খুলে দেবার দায়িত্ব প্রবীণদের। কেউ যদি ইতিহাস না পড়ে, কি করে নিজেকে সত্যের আলোয় আলোকিত করবে? আমরা যখন ইতিহাস পড়ি, ঐতিহাসিক কোন মুভি দেখি তখন নিজেকে বীরের আসনে বসিয়ে তার মত হবার ইচ্ছা জাগে মনে। নিজের ভেতরে আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে নিজের অজান্তেই। সেই আগুনকে কাজে লাগাতে হবে।

আমাদের এই অতি প্রিয় মাতৃভূমি কেবলই দূর্ণীতিতে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত থাকতে পারে না। নিজেদের চেষ্টায় তাকে আমাদের শহীদদের স্বপ্নের দেশ বানাতে হবে। অস্ত্রের আন্দোলনে না হোক, আমরা নিজেরা প্রত্যেকে তো নিজেদের অন্তত শুধরে নিতে পারি। সৎ মানুষ হিসেবে নিজের নিজের দায়িত্বটুকু পালন করতে পারি। চেষ্টা করতে পারি অন্তত পাশের মানুষটির মাঝে সেই আলো ছড়িয়ে দিতে। আমরা প্রত্যেকে যদি একেকজন সৎ মানুষ হই পুরো দেশটা কি তবে আমাদেরই সমষ্টি হবে না?

ষাট বছর অতিক্রম করেছে ভারত তার স্বাধীনতার। সেখান থেকে যদি তারা শিক্ষা নিতে পারে আমরা কেন পারব না আমাদের মুক্তিযুদ্ধ থেকে উদ্দীপনা নিতে? প্রতি মুহুর্তে তাকে স্মরণ করতে ! মাত্র ৩৫ বছরেই কি আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাস ভুলে যাবো? ভুলে যাবো লাখ লাখ শহীদের রক্তদানের কথা? আমাদের আছে একাত্তুর,আছে বায়ান্ন,উনসত্তুর....আছে ইংরেজবিরোধী স্বদেশী লড়াই...। তাদেরই রক্ত যে বইছে আমাদের ধমণীতে...।

তবে? আমরা কেন আশাবাদী হব না?

-------------------------------------------------------------------
২০০৬,জুন ২৭-এ লেখা হয়েছিলো, ঠিক এই মুভিটা দেখার পর পরই।

Friday, October 12, 2007

মহালয়ার শুভেচ্ছা


সকালে ঘুম ভাঙতেই বার্তা এলো "মহালয়ার শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা নাও"। চোখের সামনে সুচেতা'দির মায়াবতী মুখটা ভেসে উঠলো, শুরু হলো শুভেচ্ছাময় স্নিগ্ধ একটা দিনের।

বৃষ্টি বৃষ্টি মেঘলা দিন। দিদির পাঠানো শুভেচ্ছায় বারে বারে চলে যাচ্ছিলাম পূজোর সব আনন্দ-স্মৃতিতে। দিদির মুখ ভাবতে ভাবতে খুব মনে পড়লো মাসীমার কথা। ভীষন মিষ্টি চেহারার আমাদের মাসীমা-- তাঁতের পাড়ওয়ালা শাড়ী, দু'হাতে শাখা আর পলা, সিঁথিতে মোটা করে সিঁদুর আর বেশ বড়সড় একটা টকটকে লালরঙা সিঁদুরের টিপ--এই আমাদের পুরো দস্তুর বাঙালী মাসীমা, আমাদের কেমিস্ট্রি টিচার সুশান্ত স্যারের গিন্নী। স্যারের মেয়ে শিল্পী ছিলো আমাদের বন্ধু। কলেজের সময়টায় প্রতিটা পূজায় মাসীমাকে না জ্বালালে যেন চলতোই না আমাদের বন্ধুদের। এরকম বৃষ্টি দিন উপেক্ষা করে ঠিক হাজির হতাম সুশান্ত স্যারের বাসায়। খটোমটো রসায়ন ক্লাস বাদ দিয়ে তাঁরই বাসায় বসে রস আনয়নের কাজটা আমরা নিজেরাই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করতাম। খাটের ওপর এলোমেলো বসে উলটাপালটা আড্ডা, একটু পর পর কি কি জানি নানান রকমের তেলে ভাজা মুচমুচে বড়া নিয়ে আসতেন মাসীমা আর আমরা কত তাড়াতাড়ি শেষ করব সেই প্রতিযোগীতায় নামতাম যেন। এদিকে টিভিতে চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে শিল্পীর হঠাৎ চিৎকার শুনে মাসীমা দৌড়ে এলেন একবার, "কি হয়েছে?!" "না মা, শাহরুখ খানকে দেখে!" আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ছি আর মাসীমা গজগজ করতে করতে বলতে লাগলেন, "মা গো, শাহরুখ খানকে দেখে যে চিৎকার দিয়েছিস, ভগবানকে দেখেও তো দিবি না!"

মাসীমা এখন ঢাকায় থাকেন, অথচ এক শহরে থেকেও এখন আর যাওয়া হয় না একেবারেই। শিল্পীর বিয়ে হয়ে গেছে, মাসীমার মত অত মোটা করে নয়, ও সিঁদুর দেয় খুব চিকন করে, একটা কাঠির মাথায় একটুখানি সিঁদুর ছুঁইয়ে। আমার নিজের সিঁদুর খুব পছন্দের সাজ। কেমন একটা স্নিগ্ধ বাঙালীয়ানা যেন প্রকাশ পায় এতে। পহেলা বৈশাখ, ফাল্গুন, অথবা জগন্নাথ হলের পূজা দেখতে যাবার সময় যখন তাতের শাড়ি পড়ে খুব সাজি তখন সাথে সিঁথিতে সিঁদুর আর কপালে বড় একটা লাল টিপ না হলে যেন চলেই না। এরকম সেজে একবার ছবি তুলেছিলাম একটা, মা'র এত পছন্দ হলো, বড় করে বাঁধিয়ে রাখলেন ঘরের দেয়ালে। এরপর অনেকদিন পর্যন্ত আমাদের বাসায় কোন আত্মীয় এলেই চোখ কপালে তুলে বলেছে, "ওমা, সিঁদুর পরেছে কেন?! এ তো পাপ! " মামণি বলতো, "সাজার জন্য পরেছে, কি হলো তাতে?"

রোজা এসে গেলো। ক'দিন ধরে নিজেরটা বাদ দিয়ে মা'র জায়নামাজে নামাজ পড়ছি। আজ নামাজে দাঁড়িয়েও মা'র কথাই মনে হচ্ছিলো কেবল। ছোটবেলায় একবার খুব মন খারাপ করে মা'কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "আম্মু, রাধা কি কখনও বেহেশতে যাবে না?" মা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে। তারপরে খুব হেসে বলেছিলো, "কে বলেছে তোমাকে এসব? আমরা আমাদের মত করে আল্লাহকে ডাকি। আর ওরাও কত ভক্তি করে ওদের ঈশ্বরকে। যদি সত্যি সৃষ্টিকর্তা বলে একজন থাকেন, তিনি কেমন করে কার প্রার্থনা শুনবেন, তুমি-আমি কি বলতে পারি?" কতখানি বুঝেছিলাম মনে নেই, তবে সেই ছোট্টবেলায় খুব শান্তি পেয়েছিলাম কথাটা শুনে।

সেই শান্তিটাই বিশ্বাস হয়ে গেঁথে আছে আজো মনের মাঝে।

------------------------------------------------------------------
এই লেখাটা গত বছর পূজোর সময় লিখা। নিজের স্মৃতি নিজের কাছে বড় ভালো লাগার। তাই নিজের পাতায় এবারের পূজোর ক'দিন বাদে আবার তুলে রাখলাম।

বোধ

একটু আগে রুমের শেষ জেগে থাকা সদস্য হিসেবে আলো নিভিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়েছি। সোজা ঘরের সিলিংয়ে চোখ। এরপর দৃষ্টির ভ্রমণ। ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দার পাশে কৃষ্ণচুড়া গাছ, পূর্ণিমার আলোয় তার কি অপূর্ব ছায়া পড়েছে ঘরের দেয়ালে! আলোছায়ার এই সৌন্দর্য আজ বহু দিন পরে যেন আবার নজরে এলো আমার। আমার বেকার জীবনের অবসান হবে খুব শীঘ্রি, এর'চে শান্তির ভাবনা আর কি হতে পারে আমার জন্য?

ঠিক পাশের বেডে বিভোর হয়ে ঘুমুচ্ছে আমার বন্ধু রতন। বাপস, একটা মানুষের ঘুম এত গাঢ় হয়,রতনকে না দেখলে ধারণাই থাকতো না আমার। আটপৌরে জীবনযাত্রার জল-খাবারের মত স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া অসংখ্য ইতিহাস আছে আমাদের বন্ধুত্বের, ইউনিভার্সিটির এবং হল-জীবনের এই ৭ বছরে। সবাই বলে রতন-স্বপন মাণিকজোর। আজ এই মাঝ রাতে জরুরী একটা সময়ে কেন সেই ভাবনার আদিখ্যেতা আমাকে বিব্রত করছে বুঝতে পারছি না।

অন্ধকারে উঠে বসি আমি নিজের অজান্তে। নাহ, দ্বিধাটা সরাতেই হবে মন থেকে। কিচ্ছু করার নেই, আর কোন উপায় নেই আমার কাছে। ফজলু ভাইকে কথা দিয়েছি, কালকের মধ্যে টাকাটা তার হাতে দিতেই হবে; নইলে এই চাকরীটা পাবার আশাও ছাড়তে হবে আমাকে।

রতনের বালিশের নিচে রাখা চাবিটা বের করে আনা কোন ব্যাপারই না আমার জন্য। কাংখিত জিনিসটা কোথায় সেটা খুব ভালো করে জানা আছে আমার। সেটা বের করে আনার আগে চাবি হাতে তবু কয়েকটা মুহুর্ত নষ্ট হলো আবার। মনে পড়লো রতনের কথা, গতকালই এই সোনার হারটা কিনেছে সে। কিনে সবার আগে আমাকেই দেখিয়েছে। "বুঝলি, আমার পুচকি বোনটা বড় হইয়া গেলো! দেখতে শুনতে ভালো তো, বিয়াশাদির প্রস্তাব আসতেসে খালি। কবে যে ফুট কইরা চইলা যায় আমগো রে ফালাইয়া! টিউশ্যনির টাকা থেইকা সেই ফার্স্ট ইয়ার থেইকা ওর জন্য কিছু টাকা বাঁচাইছিলাম। অবাক হইছস না? আমার মত খরুচে পোলা কেমনে এত দিন ধইরা জমাইলাম এই টাকা তাই ভাবতেছস? বোনটা বড় আদরের রে, খুব আদরের"। কথা শেষ করে আশ্চর্যজনকভাবে শার্টের হাতায় চোখ মুছেছিলো রতন। আমার অবাক হবার ক্ষমতাও হার মেনেছিলো ওর এই কান্ডে। জীবনে অত ভালোবাসা কারো জন্য জমা থাকতে পারে সেই ধারণাই আমার ছিলো না!

চাবিটা আগের জায়গায় আবার রাখার পরেও রতনের ঘুম ভাঙ্গেনি, জানতাম। আগামীকাল ভোরে ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির ট্রেন ধরার আগে গুছিয়ে রাখা ট্রাভেল ব্যাগটা কাঁধে নেবার আগে একবার চেক করেও দেখবে না আমার বোকা বন্ধুটা, সেও জানি। এইসব ভাবনা কেন আমি ভাবছি? আমার উচিত স্বস্তির একটা বিশাল নিঃশ্বাস ফেলা। আমার চাকরীটা হয়ে যাবে এবার নিশ্চিত, ফজলু ভাই কথা দিয়েছে। আমি চোখ বন্ধ করি একটা শান্তির ঘুমের আশায়, বুজে থাকা চোখের কোন থেকে অকারণে গড়িয়ে পরে কি যেন একটা, আমি পাত্তা দেই না - আর কখনও দেবও না।

Thursday, October 11, 2007

স্টিল দেয়ার ইজ হোপ


ভূমিকম্প এবং যুদ্ধগ্রস্ত ছোট্ট, সুন্দর দ্বীপ সেফালোনিয়া, সেখানকার একমাত্র ডাক্তার এবং তার কন্যা পেলাগিয়া--এদের ঘিরেই সাদামাটা কাহিনীর সিনেমা "ক্যাপ্টেন করেলি'স ম্যান্ডোলিন"। কিন্তু অন্তত একটা দৃশ্যের চিত্রায়ন আর একটা চিঠির কারণে সাদামাটা এই মুভিটা আর সাদামাটা থাকে নি, অন্তত আমার কাছে।

পেলাগিয়া প্রথম যৌবনে প্রেমে পড়েছিলো প্রতিবেশী মান্দ্রাজের। তারপর যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া দূরত্বের সময়ে সে বুঝতে পারে মান্দ্রাজের প্রতি তার ভালোবাসার আসলে ততটা জোর নেই যতটা হলে তাকে ভালোবাসা নাম দিয়ে সীমাহীন সময় অপেক্ষা করা যায়। সময় যায়, আবার তার জীবনের চরম প্রতিকূল মুহুর্তে প্রেম আসে-- ক্যাপ্টেন করেলি--মার্চপাস্টের সময়েও যার পিঠের ঝোলায় দুলতে থাকে তার প্রিয় ম্যান্ডোলিন। কিন্তু অপেক্ষা--পেলাগিয়ার নিয়তির সাথে বুঝি একসুরে বাঁধা। আবার দূরত্ব এসে দাঁড়ায় পেলাগিয়া আর ক্যাপ্টেন করেলি'র মাঝে। জীবন চলতে থাকে জীবনের নিয়মে, বৃদ্ধ ডাক্তার বাবা, যুদ্ধে এতিম পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়ে আর বাবার হাসপাতালে মানুষের সেবা--এই নিয়েই বেঁচে থাকে পেলাগিয়া।হঠাৎ একদিন-- একটা মাত্র পার্সেল আবার গতি এনে দেয় পেলাগিয়ার ছন্দহীন জীবনে--ক্যাপ্টেন করেলি'র বাজানো ম্যান্ডোলিনের সুরের রেকর্ড।

ঠিক সেই সময়ে ক্যাপ্টেন করেলিকে পেলাগিয়ার বাবার লিখা চিঠি এবং তার পরবর্তি দৃশ্য আমাকে এত বেশি নাড়া যে কেন দিলো..!

"Antonio, I don't know wheather this letter will reach you or even if you are alive. Perhaps someone else sent us your record. And that is why we found the note. I would like to say that Pelagia is happy but she is full of tears she will not let fall, and over grief no doctor can mend. She blames herself for the pain we have suffered and perhaps same is true for you.

You know I am not a religious man. But i believe this if there is a wound, we must try to heal it. If there is someone who's pain we can cure, we must search till we find them. If the Gods have choosen that we should survive, it will be for a reason..."

চিঠিটার এই শেষ লাইন লেখার মুহুর্তে প্রচন্ড ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয় তাদের বাড়ি, চেম্বার, হাসপাতাল। হাসপাতাল থেকে দৌড়ে এসে পেলাগিয়া নিজেদের বাড়ির ধ্বংসস্তুপের ওপর বসে থাকা তার বাবাকে খুঁজে পায়। চিঠি এবং তার পরের মুহুর্তেই দুর্যোগের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার ভীষণ স্পর্শকাতর এই দৃশ্য-- আমার মনে হয়েছিলো প্রচন্ড হতাশাকে অগ্রাহ্য করে বেঁচে থাকার গোপন অথচ চিরকালীন মানব-মন্ত্রের একটা অসাধারণ সার্থক চিত্রায়ন।

এই রকম একটা দৃশ্য দেখলে গভীর স্বস্তির একটা নিশ্বাসের সাথে বুক থেকে বেরিয়ে আসে একটা বিশ্বাস-- " Still there is hope".

মুঠো ভরা আলো



"আমার কাছে সমগ্র দেশটাকেই পরীর দেশ বলিয়া মনে হইতো "।

উচ্চমাধ্যমিকের কোন এক শ্রেণীতে প্রথম পড়েছিলাম বিভূতিভূষন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা "আরণ্যক"-এর একটা অংশ। সেই থেকে তাঁর জাদুময় লেখনীর ভক্ত হয়ে যাওয়া। বিভূতিভূষনের আশ্চর্য সুন্দর বর্ণনা কেমন যেন আলৌকিক একটা জগতে নিয়ে যায়। তাঁর লেখা পড়তে পড়তেই সব সময় প্রার্থনা করতাম- রূপকথার পরীর দেশ নয়, বাস্তবে যদি কখনও এমন সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়াতে পারতাম !

সব সময় ভেবেছি এই চাওয়াটুকু কেবল চাওয়াই হয়ে থাকবে হয়তো, বা তাঁর মত দৃষ্টিশক্তির অভাবে দেখেও বুঝব না। ঈশ্বরের পরম কৃপা, আমার এই দুর্ভাবনা সত্যি হয় নি। আমার দেশের খুব ছোট্ট একটা গন্ডিতে ঘোরাফেরা করা এই আমি একদিন সত্যি হাজির হলাম পরীর রাজ্যে ! ময়মনসিংহ এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির আমাবাগানে ।

বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম আরো অনেক বন্ধু মিলে। সারাদিন জার্নি আর খাওয়াদাওয়াতেই কেটে গিয়েছিল সময়, জানতামই না আমার এতদিনের কাংখিত বিস্ময় চুপচাপ বসে আছে সন্ধেবেলার আশায়! অন্য কথায় যাবো না, সেইটুকুই কেবল বলি।

.......অন্ধকার চারপাশ। রিক্সা পুরো ইউনিভার্সিটি চককর দিয়ে চারপাশের হলগুলোর মাঝের একটা রাস্তায় চলতে শুরু করলো। চলতে চলতেই অন্ধকার গাঢ়তর হলো। এত অন্ধকারে একটু কেমন যেন গা ছমছম করছিলো। আর ঠিক তখনি অন্যরকম এক আলো একটু একটু করে এগিয়ে আসতে লাগলো আমাদের দিকে। একটু পরে দেখা দৃশ্যটা আমার কাছে এখনও ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না...শত শত জোনাকি! বেশির পরিমাপ বুঝাতে শত বলাটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, আসলে বোধহয় কোটি কোটি জোনাকি। নাহ, একটুও বাড়িয়ে বলছি না! আমরা যখন পূর্ণ অন্ধকারে ওখানটায় পৌঁছলাম, রাস্তার চারপাশের জলাশয়ে আর তার পাশের ঝোপঝাড় থেকে এমন করে জোনাকি বের হয়ে এলো যে আমার মনে হলো এ বুঝি ওদেরই জগৎ...ওরা দলবেঁধে এসে স্বাগত জানালো অতিথিদের। দৃশ্যটা এমন - আমাদের ডানে,বামে,মাথার ওপরে, চারপাশে কেবল জোনাকি আর জোনাকি! বোকার মত হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষন। তারপর ঘোর ভেংগে দুই হাত প্রসারিত করে এক ছুট লাগালাম অন্ধকার ঘোঁচানো জোনাকির আলোতে। চোখ বন্ধ করে হাত মুঠো করে আবার খুলতেই দেখি জোনাকি ভর্তি সেখানে! মুঠো ভর্তি জোনাকি চালান করে দিলাম বন্ধুর পকেটে। হাতের তেলোয় জোনাকি, পকেট ভর্তি জোনাকি, চারপাশটা জুড়ে কেবল জোনাকি আর জোনাকির রহস্যময় আলো....!

একটা সময় গা ছমছম করে আমার মনে হতে লাগলো জোনাকির আড়ালে এই বুঝি আমার সেই পরীর দেশ !
নয়?

Tuesday, October 09, 2007

আবার শুরু হলো

বহু দিন আগে নিজের এই ব্লগ দাঁড় করিয়ে রেখে আমি ঘুমাতে গিয়েছিলাম।

হঠাৎ সেই ঘুম ভাঙার পরে দেখি, প্রায় এক বছর কেটে গেছে! বেচারা ব্লগ তো তেমনই দাঁড়িয়ে আছে একলা একলা। তাই আজকে অল্প একটু সময় খেটেখুটে ওর চেহারাটা একটু ঘঁষে মেজে দিলাম। এবার আশা করি চলতে থাকবে, আমার হাত ধরেই।