Friday, April 17, 2020

নজমুল আলবাবের " পাতা ঝরার আগের গল্প" - আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া বা স্মৃতির চর্বণ


আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা নয়। গল্পের ছলে উল্টেপাল্টে আনা ফেলে আসা জীবন আর স্মৃতির এক মায়ার বাক্স "পাতা ঝরার আগের গল্প"। দেশ, মা, বাবা, মধ্যবিত্ত মফস্বলের জীবন- যেখানে কবিতা, গান বা নাটকের মত বোকা বোকা সংস্কৃতির চর্চা করা ছাপোষা মানুষেরা তাদের ছোট ছোট তীব্র সুখ, বেদনা এমনকি অপমান নিয়ে বেশ দিব্যি বেঁচে থাকে।

কিছু "মফস্বলীয়" মানুষ আছে, জীবনভর ওরকমই গোঁয়ার থেকে যায়। তারা শহরতলির ক্ষুদ্র গন্ডি পেরিয়ে কোন এক উজ্জ্বল শহর বা/ এমনকি ভিনদেশে বাস করেও অনেক দূরের অথচ সবচেয়ে আপন নিজের দেশের স্মৃতি সম্বল করেই আজীবন বেঁচে থাকে। সেই সব পাঠক এক একটি গল্প পড়বেন আর একটু একটু করে কোথাও নিজেকে খুঁজে পাবেন।

"পাতা ঝরার আগের গল্প" বইয়ের এই অত্যন্ত ছোট ছোট ফরম্যাটের গল্পগুলোকে "অণুগল্প" বলতে শিখেছিলাম অনেএএএক দিন আগে-  কৈশোরের কোন এক উজ্জ্বল দিনে, যেখানে "ভোরের কাগজ" বা "ভোকা" ছিলো, যেখানে "পাঠক ফোরাম"-এর জন্ম হয়েছিলো, সেখানে সঞ্জীব চৌধুরী আর গিয়াস আহমেদ "ফিচার" আর "অণুগল্প" লিখতে শিখিয়েছিলেন, কিছু "পাফোস" তৈরি করেছিলেন। আরো কিছু পথ হেঁটে তারা "বন্ধুসভা'য় পাড়ি জমিয়েছিলো। তারা "হৃৎকলম" লিখতো। সেইসব লেখকদের লেখনী হারিয়ে যায় নি তা দেখতে, জানতে, পড়তে বড় ভালো লাগে। নজমুল আলবাবের "অনুগল্প" সংকলনের এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে "হৃৎকলম" প্রকাশন থেকে, কাকতাল? হবে হয়ত। আমার কাছে তো সেও তবু কোন এক স্মৃতিরই অংশ।

Sunday, April 12, 2020

ক্যাফের শহর মেলবোর্ন

সোম থেকে শুক্রঃ প্রতি দিন ভোরবেলা লম্বা ট্রেন যাত্রা করে শহরতলী থেকে পৌঁছুই মেলবোর্ন শহরে।  ট্রেন থেকে নেমে কাজে যেতে মাত্র দু/ তিন মিনিটের পথ। এই দু/ তিন মিনিটে যে রাস্তাটা পার হই তার নাম Degrave Street। রাস্তার দুই পাশ জুড়ে সারি সারি ক্যাফে। অত ভোরেই পুরোপুরি ব্যস্ত সমস্ত হয়ে ওঠে ডিগ্রেভ ক্যাফে পাড়া আর ফ্রেশলি ব্রুড কফির মৌতাতে ম ম করে পুরো এলাকাটা। দু'টো পা ফেলার পরেই আমি বুকভরে শ্বাস নেই, আসলে নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিতে চাই পৃথিবীর সমস্ত সুগন্ধির চাইতেও যে গন্ধ আমার বেশি প্রিয় তাকে। একেকটা কফিশপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কফির মতই তাজা তাজা ছেলেমেয়েরা, তারা মিষ্টি হেসে ভোরের শুভেচ্ছা জানায়। তাদের সাথে হালকা মাথা নুইয়ে এগুতে এগুতে দেখি আরো আরো মানুষের মুখ। এই সব মানুষদের দেখে আমার কেবলই মনে হয় এদের বুঝি কোন কাজ নেই, এরা কেমন যেন, " তোমরা যা বলো তাই বলো/ আমার যায় বেলা বয়ে যায় বেলা/ কেমন বিনা কারণে " এরকম গোত্রের মানুষ। কারো মধ্যে কোন তাড়া নেই। ওরা আরাম করে বসে গ্যাছে, গোল গোল টেবিলগুলোর ধার ধরে। প্লেট ভর্তি খাবার - The famous Aussie big brekki। আছে পোচড এগস, বা স্ক্রাম্বল্ড এগ, স্যটেড মাশরুম, পোড়া পোড়া গ্রিল্ড টমেটো, স্পিনাচ, হ্যাশ ব্রাউন, টোস্টেড ব্রেড। কেউ কেউ সাথে নিয়ে নিচ্ছে, বেকড বিন, স্ম্যাশড এভোক্যাডো ইত্যাদি। সাথে যে ক্যাপোচিনো, লাটে, ফ্ল্যাট হোয়াইট ইত্যাদি হরেক পদের কফি আছে প্রতিটা টেবিলে সে তো বলাই বাহুল্য। এর সাথে আছে ব্যস্ত পায়ে রাস্তাটি কোনমতে পার হয়ে অফিস পৌঁছানোর তাড়া খাওয়া মানুষ। তারা তাদের অভ্যাসমত টুক করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কোন একটা কফিশপের সামনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাউকে মুখে বলে অর্ডার দিতে হচ্ছে না,  বারিস্তা জানেন কার জন্য কি বানাতে হবে, শুধু একবার মুখ চেয়ে নিশ্চিত করে নিচ্ছেন, "মিডিয়াম লাটে, তাই তো?" 

Saturday, June 29, 2019

ম্যাজিকাল মোমেন্ট

প্রতিবার জন্মদিনের আগে আমাদের কমন প্রশ্ন হচ্ছে - 
এবারের জন্মদিনে কি চাস”? 
উত্তরটা  কমন দুজনের তরফ থেকেই
"কিচ্ছু চাই না আমি" ব্র্যাকেটে "আজীবন ভালোবাসা ছাড়া! "
এবার যখন এই প্রশ্ন এলোতখন আমি মাসরুফ হোসেন এর "আগস্ট আবছায়াপড়ছি। জানিও না কোন ফাঁকে দুম করে বলে ফেললাম
"শেলীর কবিতার বই পড়তে চাই।"
একটা কিছু উত্তর পেয়ে সে বেশ নড়েচড়ে বসলো
"আর"? 
"শেলী যদি পড়ি তাহলে কিটসও পড়তে চাইবাবার মুখে দুই জনের কথাই শুনেছি।"
"চমৎকার। আর?"
আমাকে তখন ভুতে পেয়েছে কিনা জানিনাআমি বলে যাচ্ছি -
"রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা এখানে ওখানে পড়েছিখুবই ভালো লাগে কিন্তু আমার বই নাই" 
"আচ্ছা!" 
এবার সে মিটি মিটি হাসছে। "আমার কলিগ তার দেশে (পশ্চিম বঙ্গযাচ্ছে। দুটো বই নিয়ে আসতে পারবে আমার জন্য বলেছে। দুটোর মধ্যে একটা আপনি পছন্দ করতে পারেন"
আমার মাথায় তখন কবিতা ছাড়া কিচ্ছু নেই। বললাম,
"শ্রীজাতশ্রীজাতশ্রীজাত' কবিতার বই"

এবার আমরা দুজনই হেসে ফেললাম। আমারটা বেশ "লজ্জা লজ্জা‘ হাসি আর তার টা হল ‘সন্তুষ্ট‘ হাসি। 
তিনি ঢুকে গেলেন Amazon-এ। ট্রাম্প আর হ্যারি পটারের দেশ থেকে তিনটে আর বাকি দুটো এলো কলকাতা থেকে। 

পুনশ্চনাকবিতা পড়ার প্রহর কিন্তু আলাদা করে আসেনি। জীবন তো আসলে পদ্যময় নয়। অযাচিত অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতায় ভরা এক একটা ক্লান্তিকর দিনআর অতি অভ্যস্ত একঘেয়ে এই জীবনে মানুষ সম্ভবত বাঁচেই হঠাৎ পাওয়া খুব প্রেশাস এক একটা মুহূর্তের জন্য। সেই ম্যাজিকাল মোমেন্ট কখনো আপনি এসে ধরা দেয়। আর কখনো বা নিজেকেই সেটা তৈরি করে নিতে হয়। আর নিজের অজান্তেই আজকের প্রতিটা তুচ্ছ মুহুর্তও পরিণত হয়ে রূপ নেয় অন্য একটা অস্তিত্বেআদর করে যার নাম আমরা দিয়েছি, "স্মৃতি" "ম্যাজিকাল মোমেন্টতখন হয়ে ওঠে "ম্যাজিকাল মেমোরি" 

পুন:পুনশ্চছবিটা আমার জন্য বিশেষ তাৎপর্যময় হয়ে রইলো। এক ছবিতে আমার সবচেয়ে প্রিয় (প্রায়সব এলেমেন্ট ঢুকে পড়েছে। 

Wednesday, March 06, 2019

সকাল, বাবা আর রবিগুরুর গান

আজকের সকালটা মনোরম। কয়েকদিনের গরমের পরে বৃষ্টি, ঠান্ডা ঠান্ডা। তারপর এলো আলোঝরা রোদ। ট্রেনে জানালার পাশে বসে মনীন্দ্র গুপ্তর ভাষাতীত অসাধারণ লেখনীতে ”অক্ষয় মালবেরি” পড়তে পড়তে নিজের ছেলেবেলার টুকরো কিছু দৃশ্য মনের গহীন থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে যাচ্ছে। ট্রেন থেকে নামার পথে সাহানার গলায় নতুন এই গানটা শুনে সকাল আর ট্রেনযাত্রার ষোলকলা পূর্ণ হলো। কারণ দৃশ্যপটে এবার চলে এসেছে বাবা। আমার ছোটবেলার দাপুটে বাবা নয়, সঙ্গিহীন একলা বাবা। যে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে মৃদু আওয়াজে রবীন্দ্রসংগীত শুনছে। একটু পরেই তার হাতে উঠবে খবরের কাগজ আর চা। আমি ঘরে ঢুকতেই বাবা তার স্নিগ্ধ হাসি মুখে মেখে রোজকার মত বললেন, “সকালবেলা রবীন্দ্রসংগীত শোনার সাথে কোন কিছুর তুলনা নেই, বুঝলি মা?  “ কি গা’বো আমি, কি শুনাবো “

Saturday, June 04, 2016

কবিতা, আমার

কবেকার সেই ঘাস হয়ে যাওয়া হৃদয়ে
কুয়াশামগ্ন অথই জলের মতন যে ভালোবাসা,
সেইখানে অকস্মাৎ ভেসে ওঠে অপূর্ব শালুক, বুনোহাঁস-
কবিতা মানেই আমার কাছে জীবনানন্দ দাশ! 

Sunday, August 23, 2015

উপলব্ধি

কবেকার পুরনো সে বোধ
ক্ষণে ক্ষণে,
নিরবে নিভৃতে,
নিঃশব্দ চিৎকারে-
আজো জেগে থাকে মনের গহীনে।

অনেক কাল কেটে গেছে তার নাম শুধায়ে।
উত্তর আসে নি কোন।

এখন আর উত্তরের কোন প্রত্যাশা নেই।
আসলে,
কোন কিছুরই কোন প্রত্যাশা নেই।
যে জীবন চলে বাতাসের মত মৃদু-মন্দ অথবা দমকা ঝড়ো হাওয়ায়,
তার কাছে, তাকে থামিয়ে, কিছু
জানতে চাওয়ারও কোন মানে নেই।

যে বোধ কখনও ছড়ালো না ডানা,
কইলো না কোন কথা এত আকুলতায়,
কেবল বছরের পর বছর একই একগুয়েমিতে বড্ড গোঁয়ারের মত
ঘাপটি মেরে বসে রইলো সমস্ত চেতনা জুড়ে।
জানিয়ে দিলো,
“আমি সত্যি, মিথ্যা তোমার নিত্য দিনের আনন্দ চেষ্টা”-

আজ দশটি বছর পরে,
আমি নিজেই তার নাম দিলাম, শূণ্যতা।

Saturday, March 08, 2014

মধুবন্তী

প্লেনে ওঠার আগ মুহুর্তে ওয়েটিং রুমে বসে আছি। এরকম কখনও হয় নি, আমার সত্যিই মনে হচ্ছিলো, গতকাল আমি দেশে এসে পৌঁছালাম, আর পরের দিনই ফিরে যাচ্ছি মেলবোর্ণের উদ্দেশ্যে। তিন বোন মিলে কত বেদনাময় তবুও আনন্দের সময় একে অপরকে জড়িয়ে রইলাম। কোন ফাঁকে কেটে গেলো একটা মাস?! দেশ থেকে ফেরার পথে আমি সাধারণত খুব রিচার্জড থাকি, বাকি কয়েকটা মাস দেশের আনন্দময় সময়ের স্মৃতি মাথায় নিয়ে পার করে দিবো, তারপরে এক বছরের মধ্যে আবার দেশে, এমন মনে হয়। এবার তেমন হলো না। এবারের দেশে আসাটা যে অন্য রকম ছিলো...।

একলা বসে থাকতে থাকতে চোখ ভিজে ওঠে বারবার। ঠিক তখন পাশে বসে থাকা মহিলা তার মেয়েকে ডাকেন, “ মধুবন্তী”। আমি আনমনেই বলি তাকে, “এত সুন্দর নাম রেখেছেন মেয়ের?” খুব মিষ্টি, মায়া মায়া গর্বের হাসি হাসেন সেই মা। বলেন, “ সবাই বলে। আমি না, আমার মায়ের রাখা নাম।” বলেই একটু থামেন, খুব নরম গলায় বলেন, “খুব সুন্দর মন ছিলো আমার মায়ের”। বুঝতে পারি তার মা বেঁচে নেই। সাথে সাথে তার চেহারা আর কন্ঠের কোমল কষ্ট বড্ড বেশি পরিচিত লাগে আমার। ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নিই আমি, তিনিও। বোধ হয় কেউ কারো চোখের জল কাউকে দেখাতে চাই না।

এর মাঝে ডাক পরে প্লেনে ওঠার। হাঁটতে হাঁটতেই মনের মধ্যে নামটা গুনগুন গুনগুন করতে থাকি, “মধুবন্তী, মধুবন্তী”। আহ কি মিষ্টি, মধুময় নাম! আমার বাচ্চাকাচ্চার খবর নেই, এর মাঝে এক গাদা নাম ঠিক করে রেখেছি, সেই লিস্টে আরেকটা যোগ হলো, মধুবন্তী! তক্ষুনি মনে পড়ে আমার জানের বান্ধবীর মেয়ের নাম “ মন্ময়ী মধুরিমা”, এর মাঝে মন্ময়ী নাম রেখেছে তার ফুপু আর মধুরিমা রেখেছি আমিই। নিজের অজান্তেই হেসে ফেলি, বাহ দুই বান্ধবীর মেয়ের নামই মধুমাখা! এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের সিটে বসে গেছি। একটু পরে প্লেন ছেড়ে দিবে তখন হঠাৎ কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে মধুবন্তীর মা এসে দাঁড়ালেন আমার সামনে, “আচ্ছা আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে আমার। আপনি কি তন্বীকে চেনেন?” তন্বী আমার সেই বান্ধবীর নাম যার মেয়ের নাম মধুরিমা! আমি তক্ষুনি মুহুর্তের মধ্যে আগের জানা কিছু তথ্য আর সাত-পাঁচ মিলিয়ে চিনে ফেলি এই আপুকে, ইনি মধুরিমার ফুপু! পৃথিবীর দুই প্রান্ত থেকে “মন্ময়ী” এবং “মধুরিমা” এমনি করে “মন্ময়ী মধুরিমা” হয়ে গেলো। কি ছোট্ট আর চমক লাগানো একটা পৃথিবী আমাদের, না?