Wednesday, December 30, 2009

মধ্যপথে ঠেকলো গাড়ি...

কুয়ালামপুরে বসে লিখছি। আমার এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আমি সত্যি সত্যি দেশে যাচ্ছি!

এরকম হয়, যে ব্যাপারগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি উতসাহ, আগ্রহ, প্রত্যাশা, অপেক্ষা বা এমন যেকোন ভালো লাগা বা কষ্টের অতি মানবীয় আবেগ জড়িয়ে থাকে, সেই ব্যাপারগুলো চোখের সামনে চলে এলে আমি ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারি না। এয়ারপোর্টে তারুকে ফেলে যখন ইমিগ্রেশান পার হচ্ছিলাম, তখন আবার এটাও বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে আমি সত্যি একা যাচ্ছি। তারুর সাথে যেকোন কিছু শেয়ার করে নিতে ভালো লাগে। নিশ্চিন্ত লাগে। আজ প্লেনে মোবাইল ফোনটা সুইচ অফ করবার পরেও কতবার যে কত কারনে ওকে কল করতে ইচ্ছা করেছে...। জানা কিছু ব্যাপার, তবু কথা বলে মিলিয়ে নিতে ভালো লাগে। মানুষ আজব ভীষণ। একই সাথে ভালো লাগা আর কষ্টের মিশেল দিয়ে কি যেন আজব এক আজব অনুভূতি হয়। এতদিন পরে দেশে যাচ্ছি সেই আনন্দ, আবার সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে ছেড়ে দশটা দিন আলাদা থাকাটাও অনেক কষ্টের। এই মানুষটার কাছে থাকবার জন্যই তো দেশ আর বাবা, আপু, বন্ধুদের ছেড়ে আসা!

কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে এই প্রথম এলাম। অনেক গরম বাইরে। নেমেই একটা মজার ব্যাপার হলো, দু'টো বাংলাদেশি ছেলে, এখানেই থাকে বোধ করি, আমাকে নিয়ে ছোটখাট একটা গবেষণা চালালো। একজন নিশ্চিত, আমি বাংলাদেশি, দেখে নাকি মনে হয় বাংলাদেশি মেয়ে না হয়ে যায়ই না। আরেকজনের দ্বিধা আছে। ফাইনালি তারা এইসব কথা আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বাংলায়ই বললো, আমি কিছু বুঝি নাই ভাব করে থাকি, কি দরকার বেচারা স্বদেশী ভাইদের বিব্রত করে। একটা ব্যাপার ইন্টারেস্টিং লাগে, বাংলাদেশি, ভারতীয়দের অন্য দেশের মানুষেরা গড়পরতা ভারতীয়ই মনে করে, কিন্তু কোথাও একটা অন্যরকম তো আছেই। আমরা কেমন করে বুঝে যাই, কে বাংলাদেশের আর কে ভারতের!

নেমেই ভাবলাম, একটু নাস্তা করে কফি খাই। এক্সপেরিমেন্টের ঝামেলায় না গিয়ে ম্যাকডোনাল্ডসেই ঢুকে গেলাম। কিন্তু যেই কফি খাওয়ার উদ্দেশ্যে গেলাম তাই নেই। মানে আছে, কিন্তু কেবলই ব্ল্যাক কফি। ক্যাপুচিনো, লাটে--এইসব কিছু নেই। আমার ব্ল্যাক কফি একেবারেই চলে না। চা-কফির মধ্যে অনেক দুধ থাকবে, আর সেই সাথে গাঢ় লিকার, এবং খানিক চিনি- এই হলো আমার আদর্শ চা-কফি। সেই বিচারে লাটে খুব প্রিয়, ইদানিং ক্যাপুচিনোও ভালো লাগে। কাজেই কেবল পানিই নিলাম। আজ প্লেনে পড়ছিলাম এয়ার ট্রাভেলিং-এর সময় পিউর পানি আর জুস ছাড়া অন্য যেকোন ড্রিংক্স না নেয়াই উচিত, ওগুলো আরো শুষ্ক করে দেয় শরীর, উচ্চতায় তো এমনিতেই শুষ্ক থাকে। তো অর্ডার করে অস্ট্রেলিয়ান ডলারে পে করতে পারলাম ঠিকই কিন্তু চেঞ্জটা দিলো মালয়েশিয়ান রিংগিটে! ৮.৪৫ রিংগিট হয়েছিলো বিল, আমি দিলাম ৫০ ডলার, আর ফেরত পেলাম ১২৫.৫৫ রিংগিট। খুচরা পয়সাগুলো দেখেও মজা লাগছে। কিছুমিছু কেনা যেতো, কিন্তু লাগেজ তো অলরেডি ফুল...।

এখন যে নেট সার্ফিং করছি সেটা কে.এল. এয়ারপোর্টের ফ্রি সার্ভিস। দুই ঘন্টার জন্য ফ্রি। কানেক্ট করার আগে এই রকম হুমকি দেখেই করলাম যে, এটা সিকিউরড নয়, যে কেউ দেখতে পারবে। কিন্তু আসলে কিছু হবে না মনে হয়। বসে বাংলা লিখছি, কেউ বুঝলে তো! অবশ্য ক'দিন ধরে জিমেইল, ফেসবুকে কেউ আমার একাউন্ট হ্যাক করার চেষ্টা করছে, ইমেইল আসে, আমি নাকি নতুন ইমেইল সেট করতে চেয়েছি বা ইনফর্মেশান বদলাতে চেয়েছি। কোন ফাজিল যে এই কাজগুলো করে?

একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছে, কফিটা খেতে পারলে খুব ভালো হতো। মালয়েশিয়ান সময়ে সাড়ে নয়টা বাজে মাত্র। আমার ঢাকার ফ্লাইট আরো সাড়ে চার ঘন্টা পরে, কেমনে যে পার করি। বই আছে একটা সঙ্গে, মাহমুদুল হকের "প্রতিদিন একটি রুমাল", পড়ি। আচ্ছা আমি কি সত্যি দেশে যাচ্ছি? আজকে সত্যি বাবার সাথে দেখা হবে? একে একে সবার সাথে? আর আমার দেশটার সাথেও? এখনও মাথায় ঢুকছে না। গতকাল এক বড় ভাই উপদেশ দিয়েছেন, খুব সাবধানে থাকবেন, বাংলাদেশ এমন এক উইয়ার্ড দেশ, সব ঘটা সম্ভব। হায়, সেই উইয়ার্ড দেশটাকে দেখবার জন্যই তবু মন কেমন করে..."প্রতিদিন তোমায় দেখি সূর্যপ্রাতে/ প্রতিদিন তোমার কথা হৃদয়ে জাগে/ ও আমার দেশ/ ও আমার বাংলাদেশ"।

আর এই দশটা দিন.........পার করে দিস তারু, ভালো থাকিস, প্লিজ। আর তাড়াতাড়ি চলে আয়। তোকে ছাড়া কোন আনন্দই পরিপূর্ন হয় না যে আমার...।