Saturday, December 22, 2007

সুইট ডিসেম্বর

বিবাহের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যে এরকম প্রায় পরিকল্পনাহীনতায়, আকস্মিক ঘটনার মত দুম করে ঘটে যেতে পারে এবং সেটা নাটক-সিনেমায় নয়, বাস্তবে-- সেটা নিজের জীবনে না ঘটলে সেরকম করে বুঝতাম কি করে?!

সময়ের নিম্নাঙ্গে পায়ের বদলে অতি দ্রুত গতিসম্পন্ন চাকা অথবা উর্দ্ধাঙ্গে পাখির নরম ডানা নয় হয়ত, হয়ত জেট প্লেনের ডানা লাগানো আছে। নইলে সেই আকস্মিক ২২শে ডিসেম্বর একবার এলো আমাদের জীবনে বুঝলাম, তাই বলে বছর ঘুরে আবার সেই দিনটাই উপস্থিত? আরিব্বাবা, একটা নয় দুইটা নয়, একেবারে ৩৬৫ বার পৃথিবী ঘুরান দিয়ে দিলো এর মাঝে ?

বেশ একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে নতুন করে। বিয়েবার্ষিকী উপলক্ষ্যে লজ্জাবার্ষিকী। :-)

পৃথিবীর ব্যাপার স্যাপার ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না এখনও। মাঝে মাঝে এত তীব্র হতাশা জেঁকে বসে...আবার সেই আমাতেই জ্বলজ্বল করে কোন এক আশ্চর্য আলো! ভালোবাসা...বন্ধুতা...কি মমতামাখা সব শব্দ। কি মায়াময় অনুভূতি!

এইজন্যেই বুঝি মানুষ বেঁচে থাকে। আরো বেঁচে থাকতে চায়।

হ্যাপি এনিভার্সারি তারু।

রবিবুড়ার কাছ থেকে ধার করে একটু বলি--

"তোমায় নতুন করে পা'ব বলে
হারাই ক্ষণে ক্ষণ।
ও মোর ভালোবাসার ধন"।

Saturday, December 08, 2007

আবার খেরোখাতা

ছোটবেলায় ডায়েরী লিখার অভ্যাস ছিলো খুব। ক্লাস সিক্সে এটা প্রবল হলো। তুমুল মাত্রায় বেড়ে গেলো কলেজ জীবনে। ভার্সিটির কয়েকটা বছর...তারপরে একটা বিশাল গ্যাপ। থার্ড ইয়ার থেকে শুধু ডায়েরী লিখাই নয়, প্রায় সবই কেমন স্থবির হয়ে গিয়েছিলো আমার। আবেগ মানুষের উন্নতির পথে অনেক বড় এক অন্তরায়, বিশ্বাস করি তখন থেকেই। তাই জন্য দুঃখিত নই অবশ্য আমি মোটেও। ছোট্ট যে জীবন আমরা বাঁচি সেখানে মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট, "আবেগ"ই যদি না থাকে, তো রোবটের মত সফল হবার কোন মানে নেই আমার কাছে। অবশ্য "সাফল্য" কথাটাও তথাকথিত অর্থেই লিখেছি এখানে। তো সেই প্রায় স্থবিরতা একেবারে পূর্ণতা পেলো মামণি চলে যাবার পর। এর পরের একটা বছর আক্ষরিক অর্থেই ঠিক কিছুই করি নি আমি। ক্লাসের পড়াশোনা বা অন্য বই পড়া, গান গাওয়া, ছবি আঁকা--আমার জন্য সবচেয়ে স্বাভাবিক এই কাজগুলো পুরো বন্ধ হয়ে গেলো। অনার্সটা কিভাবে পাশ করলাম সে এক বিস্ময়! আসলে মা চলে গিয়ে মানুষের জীবনের ব্যাপ্তির ক্ষুদ্রতা বড় কড়াভাবে আমার মস্তিষ্কে গেঁথে দিয়ে গেলো।

এটা এক রকম ভালোই হলো। একটা সময় ছিলো, অনেক কিছু পাবার আকাঙ্ক্ষা ছিলো। ক্লাসে ফার্স্ট না হয়ে সেকেন্ড বা থার্ড হলে মন খারাপ হত (একবার ছাড়া ফার্স্ট আমি কখনই হই নি)। এখন আর সেসব হয় না। আমি যেমন আছি তেমন করেই এই ছোট্ট জীবনটা পার করে দিতে পারলেই আমি খুশি। সাফল্য বলতে আমি এখন বুঝি একান্ত আপন সম্পর্কগুলো। শেঁকড়, সেখানে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু নেই, তবু যা আছে সেইটুকুতে বিশ্বাস রাখা, বাবা, বড় আপু, ছোট আপুকে কখনও ভুল না বুঝা, ওদের কষ্ট না দেয়া। আর যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেছে অজান্তে, স্বার্থহীনতায়- আমার বন্ধুরা। কোন মূল্যে আমি ওদের হারাতে চাই না। কখনও নিজে কষ্ট পেলেও ওদের কষ্ট দিতে চাই না। জীবনের একটা একটা ধাপে এই মানুষগুলো কতবার কতভাবে যে আশ্রয় আর প্রশ্রয় দিয়েছে নিঃশর্তে! আর আছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া- আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে জীবনসংগী হিসেবে পাওয়া। এই সবই আমার জীবনের সাফল্য, পাওনা। আর বাকি যা কিছু, সব পথ চলতে পাওয়া। পেলেও হয়, বেশ, ভালোই... না পেলে ক্ষতি কিছু নেই।

কত কি সব বলছি। ব্যক্তিগত কথা লিখে ব্লগের পাতা ভরিয়ে ফেলছি। আসলে... ইদানিং আবার আগের মত ডায়েরী লিখতে ইচ্ছা করে। মামণি, বাবা, আপুরা আর বন্ধুরা ছাড়া আর কখনই তেমন কথা বলি না আমি... এখানে, এই ভিনদেশে কোথায় পাই ওদের? তারুর সাথে বকবক করি অনর্গল। আর কারো সাথে না, আর কেউ নেই যে এখানে আমার। তাই একলা সময়ে নিজের সাথেই কথা বলি। বলতে ইচ্ছা করে। খাতা-কলমে ডায়েরী লিখা আর হবে কি না জানি না, তাই ব্লগেই আবার শুরু করলাম। একান্ত ব্যক্তিগত কথন - আমার খেরোখাতা।

Friday, December 07, 2007

হয় না এমন হয় না...

চার মাস ধরে দেশছাড়া আছি। এমনি এমনি ঘরে বসে থাকি। ঠিক এমনি এমনি না অবশ্য, জীবনে যা কোনদিন করি নি তাই করি - ঘরগেরস্থালী। বেশ লাগে। এই পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমাকে কখনও কোন ক্ষেত্রে কোন গুরুদায়িত্ব নিতে হয় নি। পরিবারের সবার ছোট আল্লাদী মেয়ে, তাই সমস্ত ঝামেলা থেকে দূরেই থেকেছি সব সময়। বড় আপু, ছোট আপুকে দেখেছি মা'র কাজে সাহায্য করতে, আমাকে কখনও সেসব ছুঁতে দেয়া হয় নি ছোট বলে। অথবা ঘরের বাইরে যাসব কাজ, কত কিছুই থাকে না? আমাকে সেসবও করতে দেয়া হয় নি। নিজের দায়িত্বটুকুও কেমন করে যেন নিতে হয় নি কখনও। বাবা-মা, দুই বোন, এমনকি বন্ধুরাও কেমন আদর করে আগলে রেখেছে আমাকে সব সময়। ইউনিভার্সিটির প্রথম তিনটা বছর যখন তারেক ছিলো, মোটামুটি চোখ বন্ধ করে হেঁটেছি আমি সবখানে, নিশ্চিত নির্ভরতায়।

এইবার, বিয়ের ছয় মাস পরে সংসার শুরু করে জীবনে প্রথম দায়িত্ব নিতে শিখলাম আমি। আশ্চর্য একটা দায়িত্ববোধ আপনা থেকেই ভর করলো আমার ওপর। মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদা- অন্ন। অতএব রান্নাবান্না দিয়ে শুরু হলো। কুটুর কুটুর করে কত কি রাঁধি। ট্রাডিশনাল রান্নার বাইরে এখান থেকে সেখান থেকে খুঁজে খুঁজে ডিফরেন্ট কিছু করার ট্রাই করি, কখনও নিজে নিজে বানিয়ে কিছু করি। রান্নার মত একটা বিষয়ে হঠাৎ করে নিজের এরকম আগ্রহ দেখে মাঝে মাঝে নিজেই ভুরু কুঁচকে ভাবি, ঘটনাটা কি?

এই সব করে করেই যাচ্ছিলো। কিন্তু আরো কিছু একটা করা দরকার, যাকে বলে উপার্জন, নিজে নিজে- এরকম ভাবছি অনেক দিন ধরেই। টুকটাক চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম ইন্টারনেট ঘেটে। ইন্টারভিউ দিলাম সেদিন একটা, মোটামুটি রেসপন্স মিললো। ট্রেনিং-এর জন্য ডাক। তারপর ক'দিন কাজ করে দেখাতে হবে, পারফর্মেন্স ভালো হলে কাজ পাক্কা, নইলে ফুটো। আমি মোটামুটি ফুটে যাবো এরকম প্রস্তুতি নিয়েই আজকে প্রথম দিনের ট্রেনিংটা করে করে এলাম। সব অন্য রকম মানুষ, বৈদেশি। আমার কেমন ভয় করছিলো। ছোটবেলায় যেমন প্রথম স্কুলে যাবার সময় মায়ের আঙ্গুল ধরে স্কুলে যেতে ইচ্ছা করত, তেমন ইচ্ছা করছিল আজকে তারুর হাত ধরে ওখানে বসে থাকব। কেউ আমাকে কিছু বললেই তারু দিবে মাইর! হি হি। কিন্তু সেসব তো আর হয় না আসলে। যেতে হলো একাই। বকর বকরও করতে হলো, কারণ জবটা কল সেন্টার কাস্টমার সার্ভিস। কি যে জ্বালায় পড়লাম, আমি দুনিয়ার অন্তর্মুখী কম কথা বলা মানুষ, আর আমি কিনা...

কোম্পানীটা ইন্ডিয়ান। যাদের কাজে ডেকেছে তারা সবাই-ই ইন্ডিয়ান, আমি একা এক বাংলাদেশী। অনেক চটপটে ছেলেমেয়েগুলো। বয়সে আমার থেকে কম বই বেশি নয় কেউই। কি সুন্দর পটপট করে কথা বলে যাচ্ছিলো। আর আমি মুখে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বসে থাকি। মাঝে মাঝে একটা দুইটা কথা বলি। স্বভাব। বন্ধু-বান্ধব আর খুব পছন্দের মানুষ ছাড়া কথার খই আমার না ফুটেই বসে থাকে। তিন দিনের ট্রেনিং, ভালোই চলছে। হাসিখুশি ছেলেমেয়েগুলোর সাথে বসে থেকে, কথা বলে ভালোই লাগছিলো বেশ। ট্রেনিং শেষে দরজার বাইতে পা-টা রেখেই দুম করে গেলো মনটা খারাপ হয়ে। এরা সবাই বাঙালী হত, এরা আমার সেই সব চেনা বন্ধুরা হত...আমি কত শান্তি পেতাম তাহলে! তাই কি আর হয়? হয়? হয় না তো!

Thursday, December 06, 2007

সেই...

একটু একটু করে একটা সময়ে ভেঙ্গেই পড়ে সব কিছু আসলে। প্রথম যখন হুমায়ূন আযাদের " সব কিছু ভেঙে পড়ে" পড়েছিলাম, স্বপ্নবাজ আমার হজম হয় নি...মাথা গুলাতে গুলাতে কেমন যেন গা গুলিয়ে বমি পেলো। সারা রাত আমি ঘুমুতে পারি নি...চেপে রাখা রোষময় বিস্ময়ের সবটুকু পরের দিন ঢেলে দেই প্রিয় বন্ধুর কাছে। "এমন হয়? এমন হয় বল?" রু আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। বোধহয় উদভ্রান্ত অবুঝ বন্ধুকে সত্যি বলে আরো উন্মাদ করে দিতে চায় না। আমি অস্থির হয়ে রু'কে তাগাদা দি, " বলিস না কেন কিছু?" রু ওর দু'হাতের তালুতে আমার হাত চেপে ধরে, বলে, "না রে, সব কিছু কি আর এমন হয়? আমাদের চারপাশটা আমরা দেখছি না? ঠিকই তো চলছে সব, কখনও কোথাও হয়ত এমন হয়। তাই বলে সব এভাবে ভেঙ্গে পড়ে না..." ক'টা দিন তবু আমার অস্বস্তিতে কাটে, কেমন অবিশ্বস্ত মনে হয় সব কিছু। রু আমাকে আগলে রাখে- মমতায়, বন্ধুতায়, ভালোবাসায়...।

সেদিন রু'র কথা মেনেছিলাম আমি।

তারপর...

এখন আমি চোখ বুজে, মন বুজে সব কিছুর ভাঙ্গন দেখি।

একেকটা রাত যায় নির্ঘুম...দিনগুলো হাসিমুখে বিষন্ন মনে...মাথা ভারী হয়ে আসে...ফেলে আসা দেশের একটা একটা খবর - ব্যক্তিগত, পারিবারিক অথবা সামষ্টিক, ওলটপালট করে দেয় একান্ত নিজস্ব সুখের সময়গুলোকে। চোখের সামনে, অথবা আড়ালে ভেঙ্গে পড়ার শব্দ শুনি কেবল আমি...ইচ্ছা করে সেই ভাঙ্গনের উৎসবে নিজেকেও সামিল করতে। কানের কাছে ঋতূপর্ণ ঘোষের সিনেমার ডায়ালগ ভন ভন করে, " কনস্ট্রাকশন, ডিকনস্ট্রাকশন...কনস্ট্রাকশন, ডিকনস্ট্রাকশন..."। আমি কিছু কনস্ট্রাক্ট করতে পারি না। ভাঙ্গতে ইচ্ছা করে তাই। ডাউললোড ডট কম থেকে ভেঙ্গে ফেলার সরঞ্জাম যোগাড় করি আমি, ডিএক্স বল, সবচেয়ে পুরনো ভার্সন। খেলতে শুরু করি। অথবা ভাঙতে। টং টং করে একটা একটা ব্রিক ভাঙে। আমার ভালো লাগে না, ভলিউম বাড়িয়ে দি... অপেক্ষা করি একটা "ফায়ার বল" আসুক, একটা "থ্রু ব্রিকস" আসুক, একটা গুল্লি আসুক... আমি ঢিসঢাস, সটাং সটাং করে ভেঙে ফেলি সব ব্রিকস, ভাঙার শব্দ শুনি...

তারপর আর পারি না...ডিকনস্ট্রাকশনের তোড়ে হাঁপিয়ে উঠি...তারপর আবার...আবার রু আমাকে আগলে ধরে। নোনাজল আর ভালোবাসার কনস্ট্রাকশন...

ভেঙে পড়ে, পড়তে থাকে অনেকদিনের বাঁধন...
এবং গড়ে ওঠে অন্য পাড়ে...

চলে যাওয়া জননীর মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মরে গেছে সেই জননী, আমাকেই জননী হবার স্বপ্ন দেখিয়ে!

কনস্ট্রাকশন...ডিকনস্ট্রাকশন...কনস্ট্রাকশন...ডিকনস্ট্রাকশন...