Tuesday, December 30, 2008

ক্যা কোঁ ক্যা কোঁ

আহ!

অবশেষে মৌলবাদী এবং যুদ্ধাপরাধীদের বাঙালী চুড়ান্ত "না" বলতে শিখেছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে তাদের শোচনীয় পরাজয় এইটুকু আশা দেখাচ্ছে, নতুন প্রজন্ম তাদের ক্ষমা করে নি, করবে না। চিহ্নিত এইসব যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতার আসনে আর তামসা করতে দেখব না। আহা কি শান্তি। মুক্তিযোদ্ধা আলী আমানের পিঠে মারা লাথি এইবার চরম হয়ে গেড়ে বসেছে তাদেরই পিঠে।

আহা কি আনন্দ! ক্যা কোঁ, ক্যা কোঁ!

Sunday, December 14, 2008

কথোপকথন

সকাল সাড়ে সাতটা। এই সময়ে আমি জেগে বসে আছি এবং লিখছি এটা আমার জন্য মোটামুটি বিরাট কাহিনী।
ঘুমটা যে নেই চোখে তা নয়, কিন্তু ঘুমাতে ইচ্ছেও করছে না। থাকি জেগে কিছুক্ষন। ছুটিরই তো দিন, যদি আবার ঘুম পায় তো ঘুমানো যাবে।
আজ সাড়ে পাঁচটায়ও একবার ঘুম ভাঙলো। উঠে গিয়ে ফজরের নামাজটাও পড়ে নিলাম, বেশ একটা শান্তি শান্তি লাগছে।
কি যেন লিখতে চেয়েছিলাম ভুলে গিয়েছি.....

বাসায় একদম একলা থাকতে কেমন যেন আজব লাগে। এই যে তারু এখন কাজে চলে গেলো, আমার ছুটি, কি ভালো হত যদি এখন গল্প করা যেতো। কেমন হতো যদি ছোটআপুর সংগে বসে গল্প করা যেতো। সকালের নাস্তাটা তো তৈরিই থাকতো নিশ্চয়ই টেবিলে। প্লেট হাতে নিয়ে হয়ত টিভির সামনে বসে গুটুর-গুটুর গল্প করতাম দুই বোনে মিলে। বা দৃশ্যটাকে এখনকার সময়ের সাথে মিলিয়েও নেয়া যায়। এখন তো দুজনেই বড় হয়ে গেছি, কেউ একজন হয়ত উঠে গিয়ে দুপুরের খাবারের রান্নাটা চড়াতাম চুলায়। ভাব নিয়ে "কেউ হয়ত" বলার অবশ্য কিছু নেই, এই "কেউ"টা ছোট আপু থাকতে আমি হবার কোন সম্ভাবনা কোনকালেই ছিলো না, নতুন করে হবেও না। কিন্তু এখন হয়ত বা আমি ওকে একটু সাহায্য করতাম, আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্প করেই যেতাম। অবশ্য আমাদের কথায় আমি মূলত শ্রোতা, আপুই বলে যায় বেশি, আমার ভালো লাগে শুনতে...কিন্তু এখন আসলে খুব বেশি হলে আমি যা করতে পারি তা হলো বাংলাদেশের এই মাঝরাত্তির সময়ে ওর মোবাইলে একটা কল দিতে পারি। নাহ, দরকার নেই। কত কিই তো চাইলেই হয়ে ওঠে না।

কাল আমার খুব প্রিয় একটা খাবার রেধেছিলাম, কাঁচা আম দিয়ে ডাল! আমার কিইইইই যে মজা লাগে এটা। আহারে বাবারও খুব প্রিয়। আম্মু রোজ বেশ বড় সড় একটা পাতিলে ডাল রাঁধতেন, আর আমি আর বাবা মিলে সেটা সাবাড় করে দিতাম। আশেপাশে খালা-চাচীরা অবাক হয়ে বলতেন, এত বড় পাতিলে ডাল রাধেন ক্যান? সেই ডালটা যেমন তেমন হলে হবে না, মায়ের একটা স্পেশাল স্বাদ তাতে থাকবে। কখনও শুধু ডাল, কখনও সংগে টমেটো বা গ্রীষ্মকালে কাঁচাআম। আগে বুঝতাম না কেমন করে মা করেন, আর কারো ডাল কেন এত মজা লাগে না। এখন ঠিক শিখে গিয়েছি, তিন বোনই, ঠিক আম্মুর মত করে। ভাগ্যিস! আমিও প্রায় রোজ ডাল রাঁধি এখন, তবে ছোট্ট একটা হাঁড়িতে। তারুও খুব ডাল পছন্দ করে, সেও ভাগ্যিস! কালকে ডালের সাথে কাঁচা আম দেবার পর থেকেই কেবল বারবার আম্মুকে দেখাতে ইচ্ছা করছে। কি ছাতার জীবন হয়েছে, যেই মানুষটাকে দেখালে সব কিছু সার্থক হত মনে হয়, তাকেই কোথাও খুঁজে পাই না।
আচ্ছা, বাবাকে কে বলছে যে আমি ফেব্রুয়ারিতে দেশে যাচ্ছি। এ তো ভীষন বিপদ হলো! একেবারেই জানি না যে কবে যাওয়া হবে, কিন্তু এরকম আশা করে বসে থাকলে তো সমস্যা, পরে কি কষ্টটা পাবে। সেদিন যখন আমার বোনের ছেলে শাদিব আমাকে বললো, "তিততা, তুমি নাকি ঈদের এক মাস পরে দেশে আসছো?" আমি পুরাই আকাশ থেকে পড়লাম, আরো অবাক হলাম যখন শুনলাম ও বানিয়ে কিছু বলে নি, ওকে নাকি বাবা বলেছে। আহারে বাবাটাও এমন ছেলেমানুষ হয়ে গেছে। আমি কবে বললাম যে আমি আসছি? হুম, বিষয়টা হলো, কবে যেন বলেছিলাম যে ফেব্রুয়ারীতে দেশে আসতে খুব ইচ্ছা করছে। তা ফেব্রুয়ারী নিয়ে আদিখ্যেতা তো আমি সব সময়ই করি, কিন্তু ইচ্ছা করলেই আর যেতে পারবো? কি জানি, কেমন একটা আশা হয় বোকার মত, হয়ত যেতেও পারি। কিন্তু বাবাকে ফোন করে বলে দিতে হবে যেন আশা করে বসে না থাকে।

আচ্ছা, এত হাবিজাবি কি সব বকে যাচ্ছি আমি, এখনও কি ঘুমের ঘোরে আছি? আবার কি ঘুমিয়ে পড়ব? ঘুম পাচ্ছে কিন্তু জেগে থাকতে ইচ্ছা করছে। পরোটা আর ডিম ভাজি নাস্তা করতে ইচ্ছা করছে কিন্তু ভীষন আলস্য হচ্ছে। সবকিছুতে এত বৈপরিত্য কেন?

বাইরে রোদ নেই একটুও, রোদ আজও আসবে না গত কয়েকদিনে মতই। কেমন বিষন্ন চারদিক। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ে আর প্রচন্ড ঠান্ডা আর দমকা হাওয়া। তবু একে মোটেই পাগলা হাওয়া বাদল দিন বলা যাচ্ছে না। গান শুনতেও ইচ্ছা করছে না, গল্প পড়তেও না, সিনেমা দেখতেও না।

কি যে করতে পারি এখন, জানি কি আমি?

Thursday, December 04, 2008

ভরসা থাকুক

অবশেষে সুমন চাটুজ্জের একঘেয়ে সুরের কল্যানেই দুম করে কিছু একটা লিখতে বসলাম। নইলে তো রোজকার সেই যেই কে সেই মনের ভেতরে সব লিখে আজীবন ড্রাফট হিসেবে জমা করে রাখা খেরোখাতার ঝুলি। আজ দিদির সাথে টেলিফোনে কথা বলতে গিয়েও ব্যাপারোটা টের পেলাম। দিদি যখন বললেন, "মন খারাপ লাগলে ফোন দিও", আমি হেসে ফেলে বলি, "মনে মনে অনেক ফোন দেয়া হয় দিদি, বাস্তবে হয়ে ওঠে না"। দিদি হাসেন। তক্ষুনি মনে হয়, এমনি করেই আরো কত কি রোজ করব বলে ভেবেও করা হয়ে ওঠে না, কিন্তু আমার মনে মনে সেসব যেন ঠিক ঠিক হতে থাকে। যেমন এই টুকটাক দিনকার খানিক লিখালিখি। এমনি হাবিজাবিসহ বেশ কিছু বিশেষ বিষয় নিয়ে লিখতে চেয়েছি। কাজে যাবার পথে মাথার মধ্যে সেইসব কথা ঘুরপাক খেয়েছে, খুব সুন্দর উচ্চারনে পরিপাটি করে যত্ন নিয়ে আমি নিজের মধ্যে সেইসব কথা বলে গেছি, যেন বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সাক্ষাৎকার দিচ্ছি কারো সামনে বসে। মনে মনে পুরোটা বলা হয়ে গেলে ভাবি, আজ বাড়ি ফিরে এই কথাগুলোই লিখে ফেলি না কেন? কিন্তু মন বেচারা মনে হয়, এতে খুব ক্ষেপে যায়। কেন রে বেটি, সব বলা হয়ে গেলো আমার কাছে, আবার কেন আঙুলে ছোট ছোট বোতাম টিপে সেইসব কথার চর্বিত চর্বন? কোন মানে হয়? তারচে' ভুলে যা, যা জানার আমি তো জেনেই গেছি, নয়?

মনের সাথে এই আমার প্রায়দিনের খুঁনসুটি পর্যায়ের বিতন্ডা। অনেক কিছু লিখতে গিয়েও মনের মধ্যে হারিয়ে ফেলা।

কিন্তু সুমন বাবু অনেক বারের মত আজ আবার নাড়া দিলেন। কেমন করে কোন খানে বলতে পারি না। তবু ওইসব সুর আর গান মনটাকে আরো বেশি বিষন্ন করেই নাকি অনেক বেশি আশ্বাস দিয়ে কি যেন করে দিলো। আর অমনি উঠে বসে এইসব অনর্গল প্রলাপ লিখতে লিখতে আবার ভাবি, "একেকটা দিন মসৃন/ মিলে যায় মোটামুটি হাতে কিছু থাকে/ একেকটা দিন উঁচুনিচু/ কেউ নিলে পিছু/ ধোকা দিলে চুপিসারে কোনের দরজায়/"...তবু হাল না ছাড়ার গান থাকে। থাকে ভরসার গান। তো, থাকুক। ভরসা থাকুক।

Friday, November 14, 2008

"আগুনপাখি" পড়েছি বলে

এইমাত্র একটা উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম। উপন্যাস নয়, যেন পূর্ণ একটা জীবন-দেশ-ইতিহাসের দলিল। হাসান আজিজুল হক-এর "আগুনপাখি"। বইয়ের পাতা বন্ধ করে দেখি চোখে কেমন পানি আসতে গিয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে, বুকের ভেতরটা গুমড়ে উঠতে গিয়ে শক্ত হয়ে উঠছে, ঠিক তারই মত। সে-- নাম কি তার? পুরো উপন্যাসে কোথাও কি তার নাম এসেছে একবারও? মনে পড়ছে না তো। কিন্তু সেই এই উপন্যাসে প্রধান চরিত্র, তার বয়ানেই সবটা বলা।

সেই বয়ান বড় সরল। ঠিক ঠান্ডা জলের মত শান্তিময়। কত কি ঘটে গেলো তার জীবনে।

আমি গ্রামে জন্মাইনি। মাঝে সাঝে হঠাৎ বেড়াতে যাওয়া ছাড়া গ্রামের কিছুই জানি না। "আগুনপাখি" পড়েছি বলেই এই গ্রাম্য সরল মহিলার বয়ানে গ্রামীন জীবন এবং তা দেশ-কাল অতিক্রম করে জীবন্ত হয়ে আজ আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন আমিই মাতৃহারা কৈশোরে ভাই কোলে নিয়ে পার করে দিতাম বেলা। তেমনি দিন পার করতে করতেই একদিন পা দিয়েছিলাম নতুন সংসারে। রূপকথায় শোনা "ফসলভরা ক্ষেত, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ" নিয়ে সমৃদ্ধ ছিলো সেই সংসার। মস্ত বড় বাড়ি, তেমনই বড় সংসার, স্বামী-সন্তান-শাশুড়ী-ননদ-দেওর-ভাসুর-জা আর রাখাল-মানিষ-মুহুরী নিয়ে ভরা। কোথাও কোন কমতি নেই। কত্তা বড় শক্ত-শীতল মানুষ, একা সামলে চলেন গোটা সংসার। তার কথার উপরে কেউ কোন কথা বলে না। সেই তুমুল সুখের জীবনেই হঠাৎ কোন দুনিয়ার যুদ্ধের ছায়াও লাগে। হঠাৎ পরনের কাপড়ে বড্ড কমতি পড়ে যায়। সেই সাথে স্বদেশী আন্দোলনে একাত্ব হয়ে মোটা কাপড় পরা শুরু হয়, একদিন সেই কাপড়ও আর যেন জোটে না। সূতা-রং আর অন্যান্য কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় দেশী তাঁত। এর মাঝে "ওলাবিবি" আর "মা-শেতলা"ও ছাড়ে না...গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে তারা কলেরা আর বসন্তে নিঃশেষ করে দিয়ে যায় গ্রামকে গ্রাম। প্রকৃতিই বা ছাড়বে কেন? পরপর দু'বছর ফসল হয় না--একবার খরায়, একবার অতি বর্ষনে। হায় আকাল। তবু এই করেই দিন যায়। দুঃখ-কষ্টে ভেঙে ছত্রখান হয়ে যায় সেই বিশাল সংসার, সবাই আলাদা, যার যার মত। আকাল কাটে, আসে নতুন দুর্দিন। দেশে স্বাধীনতার আন্দোলনের মাঝে কে যেন রব তোলে মোসলমানের আলাদা দেশের দাবি তুলে। শুরু এক সম্পূর্ণ নতুন যুদ্ধ, হিন্দু-মোসলমানের যুদ্ধ। দিকে দিকে হিন্দু আর মোসলমান একে অপরকে মেরে কেটে এতদিনের সহাবস্থান সব ভুলে যায়, ভারতবর্ষ স্বাধীন করে দেবার আগে ব্রিটিশদের শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়। আসে স্বাধীনতা, আর ভেঙে টুকরো টুকরো হয় ভারতবর্ষ।

এই আমার শেকড়, আমার ইতিহাস।

এই মহিলা, যিনি আজীবন মুখ বুজে কেবল পিতা বা স্বামী বা শাশুড়ীর আদেশই পালন করে গেলেন। নিজের কোন অভিমত কোন বিষয়ে দিতে গেলেন না এবং তা হাসিমুখেই, সেই একই মানুষ তার সমস্ত জীবনের সবটুকু অভিজ্ঞতা নিয়েই সবার বিপরীতে, সবার অমতে আঁকড়ে রইলেন তার দেশের মাটি।

দেশভাগের পরে সবাই যখন আলাদা হয়ে যাওয়া মোসলমান দেশ পাকিস্তানে যেতে শুরু করলো, তখন নিজের দেশে বসে থেকে তিনি ভাবেন--

"আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না ক্যানে আলাদা একটো দ্যাশ হয়েছে গোঁজামিল দিয়ে যিখানে শুদু মোসলমানরা থাকবে কিন্তুক হিঁদু কেরেস্তানও আবার থাকতে পারবে। তাইলে আলাদা কিসের? আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না যি সেই দ্যাশটো আমি মোসলমান বলেই আমার দ্যাশ আর এই দ্যাশটি আমার লয়। আমাকে আরো বোঝাইতে পারলে না যি ছেলেমেয়ে আর জায়গায় গেয়েছে বলে আমাকেও সিখানে যেতে হবে।"

হায়, হিন্দুরাষ্ট্র আর মুসলমানরাষ্ট্র তত্ত্বর অসাড়তা, অবাস্তবতা এবং অকার্যকরিতা ভারতবর্ষর হাজারো সাধারণ মানুষ মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করলেও, করে নি দেশের হর্তা কর্তারা।

ইতিহাস, কিন্তু তথ্য-তত্ত্বর খটখটে বিবরণ নয়, অতি সাধারণ গ্রাম্য এক মহিলার জীবনের ছবি এঁকে, তারই মুখে সেই জীবনের কাহিনী বর্ণনা করে যেভাবে এখন থেকে অনেক কাল আগের সেই সময়ে লেখক নিয়ে যেতে পেরেছেন পাঠককে, এর চেয়ে সহজে আর কি করে ততটা বাস্তব উপলদ্ধির জন্ম দেয়া যেত আমার জানা নেই। "আগুনপাখি" হাসান আজিজুল হক-এর প্রথম এবং এ পর্যন্ত একমাত্র উপন্যাস। ১৯৬০ সাল থেকে লেখালেখি করে এতটা স্বনামধন্য হবার পরেও কেন এতদিন কোন উপন্যাস লিখেন নি, এই প্রশ্নের মুখে "আগুনপাখি" একটি যথার্থ উত্তর। এরকম একটি উপন্যাস সারা জীবনে একটি লিখতে পারলে বোধহয় লেখক জীবনে আরও খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন পড়ে না।

Thursday, November 06, 2008

এই স্বপ্ন ভেঙে না যায়...

রোজ সকালে এলার্ম দেয়া থাকে, সুন্দর একটা সময়, যেন সব কিছু ঠিকঠাক করে নেয়া যায়। আমার ওঠা হয় না। ন'টার এলার্ম পেরিয়ে দশটা, এগারোটা...। কোনমতে ঘুম ভেঙে ধুমধাম। সেই ঠিকঠাক করে আর কিছুই করা হয়ে ওঠে না। আজও তাই হলো। কিন্তু আজ সকালের ঘুমে স্বপ্ন দেখেছি...দারুণ! দেখি আমি দেশে গিয়েছি। বাবা, ছোট'পু, বড়'পুর সাথে দেখা হলো, ওদের জড়িয়ে ধরে কত গল্প। ধোঁয়া ধোঁয়া স্বপ্ন নয়, একদম যেন টলটলে জলের মত...পরিষ্কার অনুভূতি। তারপর দেখি, সবাই মিলে ঘুরতে গিয়েছি...সাগর পাড়ে।

তারপর কেমন যেন স্বপ্নের মাঝেই বুঝতে পারি, এইসব ভালোলাগা সত্যি নয়। আত্মাটা বুঝি উড়ে চলে গিয়েছিলো সাত সাগর পাড়ি দিয়ে আমার আপন দেশে, আর একটু একটু করে যখন সে ফিরে এসে আমার দেহে আবার বসতে থাকে, ঠিক তখনই বুঝতে পারি আমি স্বপ্ন দেখছি। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে যতই আমি বাস্তব থেকে স্বপ্নে ফিরে যেতে চাই, বাস্তবতা ততই আরো আষ্টেপৃষ্ঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার অস্তিত্ব থেকে সবাইকে দূরে সরিয়ে নেয়...

ভেঙে যায় আমার স্বপ্ন।

বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে...ভীষন! এখনও বাড়িতেই আছি, নিজের ঘর, নিজের সংসার। অনেক ভালোলাগা, অনেক ভালোবাসা প্রতি মুহুর্তে ঘিরে থাকে। তবুও...কেমন যেন ইচ্ছে করে একটুখানি বাবার কোলে বসতে, আপুদের সাথে আল্লাদি করতে। একটুখানি আমার নিজের দেশের দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে...

কবে যাবো?

Tuesday, October 28, 2008

বাদলা দিনে মনে পড়ে


দেশে নাকি খুব বৃষ্টি হচ্ছে ক'দিন ধরে। গরম থেকে আস্তে আস্তে ঠান্ডা পড়ে যাচ্ছে। এই সব খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া প্রকৃতির। তবু দূর থেকে শুনে কেমন যেন অন্য রকম মনে হয়। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। হঠাৎ যখন একটু একটু করে হালকা শীত পড়তো, সেই সময়টার কথা। হঠাৎ একদিন ফ্যান চালানো বন্ধ হয়ে যায়। বারান্দার রোদ্দুরে চেয়ার বা মাদুর পেতে বসে কিছু পড়তে খুব ভালো লাগতে শুরু করে। রাতে ঘুমানোর সময় একটু ভারী কাঁথা গায়ে জড়ানো শুরু হয়ে যায়। কেমন আদুরে, সুন্দর একটা সময়। এটাই তো হেমন্ত, না? ছোটবেলায় খুব ছবি আঁকার ঝোঁক ছিলো। একটা ছবির কথা মনে পড়ছে, গাঁয়ের মেঠো পথে একজন কৃষক মাথায় নতুন ফসলের ঝাঁকা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তার পাশে কিছু গাঁয়ের বধু-ঘোমটা পরা, তাদের শাড়ির রঙ খুব উজ্জ্বল করে রাঙাতাম আমি, হয় সবুজ শাড়ি লাল পাড়, নয়ত লাল শাড়ি সবুজ পাড়--এই ছবির মানেই হেমন্ত।

লিখতে গিয়ে খুব অবাক হয়ে ভাবছি, তখন এই হেমন্ত'র মর্ম বোঝাটা কত কৌতুহল-উদ্দীপক ছিলো। এবং এরকম সবকিছুই। এখন যেমন খুব জেনে গিয়েছি,অনেক কিছুই। তখন সেই স্বপ্নমাখা, কৌতুহলী মনে সব কিছুই ছিলো নতুন আবিষ্কারের মতন আনন্দদায়ক। এই যে, ফসল তুলে কৃষকের ঘরে ফেরা মানেই হেমন্ত,পিঠা-উৎসব--এই জানাটাও কত উত্তেজনাকর ছিলো তখন! সবকিছুতেই অবারিত সম্ভাবনার সম্ভাবনা।

ইদানিং এরকম আবার অনেক কিছু নতুন করে জানতে ইচ্ছা করে। ঠিক তখনকার মত করে। আবিষ্কার করতে ইচ্ছা করে একেকটা শব্দের মানে, নতুন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে"র পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলামেরও তালগাছ নিয়ে একটা ছড়া আছে যেদিন জানতে পারি, সেই নিয়ে সে কী আনন্দ আমার। ক্লাসের বন্ধুদের উৎসাহ নিয়ে বলি, তোমরা কি এই কবিতাটা পড়েছো কখনও, "ঝাকড়া চুলো তালগাছ/ তুই দাঁড়িয়ে কেন ভাই?/ আমার মত পড়া কি তোর/ মুখস্থ হয় নাই?" কেউ জানে না, কেউ পড়ে নি...আমি পড়েছি, এইটুকুতেই সে কি আনন্দ!!

আহা ছেলেবেলা! কি পরম ঐশ্বর্য জীবনের। কেমন যেন মনে হয় খুব বেশি যত্ন করে একেকটা স্মৃতিকে আলাদা আলাদা রেশমী কাপড়ে মুড়ে মণিমাণিক্যখচিত দামী সিন্দুকে ভরে মস্ত ঢাউশ একটা তালা দিয়ে জমা করে রেখেছি। চাবিটাকে রেখে দিয়েছি এত বেশি গোপন কুঠুরীতে যে মাঝে মাঝে খুঁজেই পাই না। হঠাৎ যদি তার সন্ধান পাই, চারপাশে খুব সাবধানে তাকিয়ে সন্তর্পনে পা ফেলে আমি সেই সিন্দুকের কাছে যাই। ডালা খুললেই ঝিলিক দিয়ে ওঠে সেই সব অগণিত অমূল্য সম্পদ। একেক দিন একেকটাকে দেখি আর ভাবি, নাহ ততটা গরীব বোধহয় নই সত্যি আমি।

বৃষ্টি নিয়ে একটা গান।

Sunday, October 05, 2008

রঙ








নানান কারনে মন খারাপ হয়ে কেমন যেন ধূসর হয়েছিলো সব কিছু। একটার পর একটা দুঃসংবাদ। একটু একটু করে সেই সব কাটিয়ে ওঠার খুব চেষ্টা করে যাচ্ছি। আজ কি ভেবে ব্লগের চেহারাটাও বদলে দিলাম। রঙ্গীন আনন্দময় হোক চারপাশটা, সেই প্রচেষ্টায়।

এর মাঝে ঈদ পার করেছি। এবারের ঈদটা বেশ কেটেছে। দুঃসময়ের মাঝে কেমন যেন একটা আনন্দ-বাতাসের মত। অনেক রান্নাবান্না, খাবারের আয়োজন...তার মাঝে সময় করে এক ফাঁকে হাতটা মেহেদিকে রাঙিয়ে নেয়া, পরিচিত জনদের বাসায় গিয়ে দেখা করা, নিজের বাড়িতে আপ্যায়ন করা- এই সমস্ত কিছুতেই কেটে গেলো বেশ উৎসবের আমেজ নিয়ে। তার মাঝে সারাটা দিনই ঘুরে ফিরে বিদ্যুৎ ঝিলিকের মত পুরনো ঈদের স্মৃতি উঁকি দিয়ে গ্যাছে। মনে পড়েছে ভোরবেলা বাবা নামাজ পড়তে যাবার আগে সালাম করা, তিন বোনের মিলিত আনন্দ, খুব জোরে গান বাজানো, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া, মনে পড়েছে মা'কে, সারাটা দিন কেমন পরিশ্রম করে এটা সেটা রেঁধে আমাদের আনন্দের সময় করে দিতো মা। সময় বদলায়, দায়িত্ব বদল হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কত কি-ই করতে পারি এখন, কিছু ইচ্ছায়, কিছু অনিচ্ছায়...দায়িত্ব নিতে পারি। কেবল মা-ই কিছু দেখে গেলেন না।

ঈদের পরদিন এবার দারুন একটা জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। টিউলিপ মেলা। টিউলিপ আমার বরাবরের প্রিয় ফুল। মাঠ জুড়ে ধানক্ষেতের মত টিউলিপ ক্ষেত! ব্যাপারটা চিন্তা করতেও অসাধারণ লাগে। কিছু জরুরী কাজে অনেক দেরি হয়ে গেলো পৌঁছুতে। পাঁচটায় ফেস্টিভাল বন্ধ হবে, আমরা পৌঁছুলাম সাড়ে চারটায়। আধঘন্টা বেশি ঘুরতে দিয়েছে অবশ্য কর্তৃপক্ষ, তাই রক্ষে। এত এত রঙ্গীন ফুলের মাঝে দৌড়াদৌড়ি, ঘুরোঘুরি করে মনটা কি ফুরফুরে যে হয়ে উঠেছিলো। ওই সময়টুকু জুড়ে কেবল রঙ গুলোই ঘিরে ছিলো মনটা। ইশ, পুরো জীবনটা যদি এরকম রঙীন হত!

বলে, লিখে এমনকি ছবি তুলেও এই সৌন্দর্য ধরে রাখা যায় না, তবু কিছু ছবি ব্লগে দিয়ে রাখলাম...থাকুক, একটু রঙীন চিহ্ন থাকুক।

Sunday, September 28, 2008

জুবায়ের ভাই...সুখে থেকো ভালো থেকো

যে মানুষটিকে নিয়ে লিখতে বসেছি তাকে নিয়েই লিখব ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু বিষয়বস্তুটা যে এমন করে বদলে যাবে, কিছুতেই তো বুঝতে পারি নি আগে। এখনও কি বুঝছি? বিশ্বাস করতে পারছি? না জুবায়ের ভাই, তিনটা বিষন্ন দিন পার করে এখনও বিস্ময়ে ভাবছি, সত্যি চলে গেলেন এতটা দূরে?

গত তিনটা দিন অসংখ্যবার একটা কিছু লিখব ভেবে শিউরে উঠে দূরে সরে গিয়েছি...এও কি হয়? এই ভীষন প্রাণবন্ত জীবন্ত মানুষটাকে নিয়ে কি করে এমন শোকগাঁথা লিখা যায়? কেন লিখতে হয়? গত মাসে সচলায়তনে তার অসুস্থতার খবর পড়ে আঁতকে উঠেছিলাম, এত প্রিয় মানুষটা এত কষ্ট পাচ্ছে এই ভেবেই কষ্ট হচ্ছিলো। কিন্তু ভীষন বিশ্বাস ছিলো, বেশিদিনের জন্য নয়, জুবায়ের ভাই সুস্থ হয়ে উঠবেন অতি শিঘ্রী। এসেই আনন্দমাখা একটা পোস্ট দেবেন। আমরা সবাই ঝাপিয়ে পড়ে সেই পোস্টে মন্তব্য করে, পাঁচ তারা দিয়ে তাকে স্বাগত জানাবো আর খুব করে বকে দেব মাঝের কয়েকটা দিন আমাদের এরকম দুশ্চিন্তায় রাখার জন্য। সচলায়তনে আমার পরবর্তী পোস্ট হবে জুবায়ের ভাইয়ের সুস্থতা উপলক্ষ্যে আনন্দপোস্ট, কি লিখব সেইসব ভাষাও ঠিক করে রেখেছিলাম। একটা মুহুর্তের জন্যও কি এই ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবেছিলাম?

আজকে লিখতে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। এই মানুষটা বয়সে আর সবার চাইতে অনেকটা বড় হয়ে কখনও দাদাগিরি ফলালেন না, অনেক বেশি অভিজ্ঞ লেখক হয়েও কখনও আমাদের শিক্ষানবিস বলে ছোট করে দেখলেন না, আমাদের পাশে ঠিক চিরতারুণ্য ধরে রেখে প্রিয় বন্ধুর মত বলে গেলেন নিজের কথা। দেখালেন তার বাতিঘরের আলো।

জুবায়ের ভাইয়ের লেখা আমি প্রথম পড়ি সামহোয়ারইন ব্লগে, তার উপন্যাস "পৌরুষ"। প্রতিদিনই দেখতাম একজন নতুন ব্লগার (তখনও জানি না কতদিনের লেখক তিনি) ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসের একেকটি পর্ব পোস্ট করতেন। আমি খুব অবাকই হয়েছিলাম, ওই ব্লগের ওই পরিবেশে উপন্যাস পোস্ট করার সাহস দেখে। পড়ব পড়ব করে পড়া হচ্ছিলো না। একদিন প্রিয় বন্ধু আনোয়ার সাদাত শিমুল বললেন উপন্যাসটি পড়া শুরু করতে। শিমুলকে ধন্যবাদ সেই থেকেই আমার জুবায়ের ভাইয়ের লেখা এবং তার সাথে পরিচয়। আমি যখন উপন্যাসটি পড়তে শুরু করি ঠিক সেইদিনই তিনি শেষ পর্বটি পোস্ট করেছিলেন। "প্রজাপতি" নামে ওখানে আমি ব্লগিং করতাম। আমি মন্তব্য করার পরে বললেন,

প্রজাপতি, শোনা কথা বিশ্বাস করতে নেই। :-) আজ এই একটু আগে এই লেখার শেষ কিস্তি পোস্ট করেছি। কাকতালীয় হোক বা ইচ্ছাকৃত, বিলম্বে ক্ষতি কিছু হয়নি। শামিল হওয়ার জন্যে ধন্যবাদ।

আমার কেমন মনে হলো, যেন খানিক মন খারাপ হয়েছে কেউ এত দেরিতে পড়া শুরু করেছে বলে। যদিও ব্যাপারটা মোটেও সেরকম ছিলো না, তিনি তো আর আমার মত ছেলেমানুষ ছিলেন না! এই কথোপকথনগুলো খুব মনে পড়ছে, আর তো কথা হবে না কখনও, এইটুকুই নিজের কাছে এনে রাখি।

প্রজাপতি: জুবায়ের ভাই, পড়ছি কিন্তু। প্রথম পর্বে বলেছি বিশ্বাস করেন নি ঠিকমতো। এই যে একটু করে চিহ্ন রেখে গেলাম। আজকে টানা অনেকটা পড়ব। এবং পড়তে ভালো লাগছে। তার'চে বড় কথা, আগ্রহ বোধ করছি সামনে এগুনোর।
মুহম্মদ জুবায়ের: প্রজাপতি, একটু ভুল বুঝেছেন। আপনি পড়ছেন সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করিনি। আমার লেখা সম্পর্কে প্রশংসামূলক কথা শুনেছেন জেনে বলেছিলাম শোনা কথা বিশ্বাস না করতে। অর্থাৎ পড়ার জন্যে আপনাকে পরোক্ষে তাগিদ দেওয়া আর কি! :-)


এরপর প্রতিটা পর্বেই আমি যে পড়েছি সেই চিহ্ন রাখার একটা ছেলেমানুষী শুরু করলাম। জানি না সেইজন্যই কিনা জুবায়ের ভাই আমাকে মনে রাখলেন। সচলায়তনের একদম শুরুর দিকে আমার জন্মদিনের তারিখ পড়লো। জন্মদিনের পোস্টে কারও মন্তব্য পেলে খুবই ভালো লাগে কিন্তু কেউ শুভেচ্ছা না জানালে তো দোষের কিছু নেই। তবু জুবায়ের ভাইকে ঝাড়ি দিলাম আমাকে শুভেচ্ছা না জানানোর জন্য। তিনি খুবই দুঃখিত হয়ে বললেন, "কেমনে বুঝব যে নিঘাত তিথিই ওই বাড়ির প্রজাপতি?" তারপরে ওই পোস্টে গিয়ে বললেন,

মুহম্মদ জুবায়ের
| শুক্র, ২০০৭-০৬-১৫ ০২:৪১

দেরি হইছে তো কী হইছে? এখন চিল্লাইয়া কই, শুভ জন্মদিন।

কেউ বলবে এই মানুষটার মধ্যে সিনিয়র লেখকসুলভ কোন অহংকার আছে? আমার মত এরকম অনেককেই ক্রমাগত মন্তব্য দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। বন্ধু হয়ে থেকেছেন। মন্তব্য-প্রতি মন্তব্যে কত মজা করা, দুঃখ ভাগ করে নেয়া...। দেশের বাইরে আসার পর আমি ক্রমাগতই দেশ নিয়ে মন খারাপ করা পোস্ট দিয়ে গিয়েছি সচলায়তনে। একবার সেরকম এক পোস্টে নিজের প্রতি কেমন জেদ নিয়ে লিখলেন,
মুহম্মদ জুবায়ের | বুধ, ২০০৮-০৪-০২ ১৪:১৩

আমরা সবাই দেশের কথা ভেবে, আপনজনদের কথা ভেবে বিষাদাক্রান্ত হবো, চলে যাবো বলে সংকল্প করবো। কিন্তু সেই সংকল্প ভুলে যাবো পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের আর যাওয়া হয়ে উঠবে না। যাবো-যাচ্ছির বিলাসিতাই সার। কাউকে ছোটো করার জন্যে বলছি না, এটা আমার নিজের কথা বলা। নিজেকে ধিক্কার দেওয়া। বাইশ বছর হয়ে গেলো ....


সেই সমস্ত স্মৃতিগুলোই ঘুরেফিরে বারবার চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। হতভম্ব হয়ে বুঝার চেষ্টা করছি, তার লেখা গল্প, উপন্যাস, ব্লগ, দেশচিন্তা, তার বাতিঘরের আলো এবং বন্ধুর ও অভিভাবকের মত সমালোচনা বা আলোচনা সব কিছু থেকে কি আশ্চর্য অলীক দ্রুততায় এবং অকস্মাৎ আমরা বঞ্চিত হয়ে গেলাম!

এই সমস্ত কথা এবং আরো অনেক অনেক কথাই এখন আমাদের হৃদয়জুড়ে। যতটা কথা, তার চেয়েও বেশি দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার। জানি না আমাদের প্রিয় জুবায়ের ভাই কোথায়, কেমন করে আছেন। আমরা রয়ে গেছি এখনও এইখানেই, তার অস্তিত্ব বুকে ধারণ করে। প্রিয় জুবায়ের ভাই, আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। শান্তিতে থাকুন।

আমরা আপনাকে কখনও ভুলব না।

Sunday, September 14, 2008

অগাস্ট পেরুলো, বাঁচলাম।

কেমন করে যেন সময় চলে যায়। নিজের ব্লগের দিকে তাকিয়ে দেখি, জুলাই-এর পরে আর কোন লেখা নেই। আমি লেখাতে অনিয়মিতই থাকি ব্লগে, কিন্তু পুরো অগাস্টে কোনই লেখা নেই দেখে অদ্ভুত লাগছে। অন্তত নিজের ব্লগস্পটে তো হাবিজাবি অলেখাগুলো লিখি, কেউ দেখবে না ভেবে, এখানেও কিছু নেই। এই মাসটায় কিছুই কি ঘটে নি লেখার মত? এমনকি নিজের ডায়েরীতেও? ...অগাস্ট মাসটাকে আমার ইচ্ছা করে আমার জীবন থেকেই মুছে দিই। কি আছে অগাস্টে? দুইটা তারিখ অভিশাপের মত কালো অন্ধকার হয়ে থাকে। পনেরো আর তেইশ। পনেরো অগাস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুদিন, পুরো পরিবারসহ। এরচেয়ে কালো কোন অধ্যায় তো আর নেই বাংলাদেশের ইতিহাসে...নির্মলেন্দু গুনের কবিতাটা মনে পড়ে, "আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো"।

এরপরে আরেকটা তারিখ যোগ হলো ২০০৫-এ, ২১ অগাস্ট। বোমা মারা হলো আওয়ামী নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে। তিনি বেঁচে গেলেন ভাগ্যজোড়ে, হয়তো দুর্ভাগা পুরো পরিবারের অবশিষ্ট সবটুকু আশির্বাদ তাকে আগলে রেখেছিলো। কিন্তু মরতে হলো সেই সভায় আসা সাধারণ কিছু মানুষকে, ইশ, কি ভীষন অনর্থক মৃত্যু! জীবন্মৃত হয়ে আজো বেঁচে আছেন মৃতদের চাইতেও হতভাগ্য আরো ক'জন। লিখতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেদিনের পেপার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাশের ছবি! ওহ ঈশ্বর, আমি ভুলতে চাই...!

২০০৫-এর ২১শে আগস্টে আম্মুর সাথে কথা হলো, তখন আমি ইউনিভার্সিটির হলে, অনার্স থার্ড ইয়ার ফাইনাল চলছে। মামণি খুব চিন্তায় ছিলো, আমি আবার ওই সভায় গিয়েছি কিনা, কি অমূলক টেনশান- মায়েরাই কেবল করেন। তাকে বুঝিয়ে শান্ত করা হলো। আর মাত্র দু'দিন পরে ২৩ তারিখ, আমার শেষ পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ করেই বাসায় ফিরে আসব। তখন এইসব টেনশানের আলাপ বাদ দিয়ে আমরা সব মজার মজার গল্প করব। মা আমার আশ্বস্ত হন। একটা মাস ধরে দিন গুনে চলেছেন কবে আমি পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরব, আর মাত্র দু'টো দিন। তেইশ তারিখের শেষ পরীক্ষাটা আমার খুব ভালো হলো। অভ্যাসবশত পরীক্ষা শেষ করেই আম্মুকে ফোন দিলাম, কেউ রিসিভ করলো না। ভাবলাম নিশ্চয়ই মা ঘুমুচ্ছেন। বন্ধুদের সাথে তুমুল আড্ডায় মেতে উঠলাম, শেষ পরীক্ষা বলে কথা। বাসা থেকে একটা ফোন এলো কিছুক্ষন পরে, আমি যেন বাসায় চলে যাই, মা'র শরীর খারাপ করেছে আরো।

বাসে যেতে যেতে কত কি ভাবলাম। মামণির একবার গলব্লাডার স্টোন অপারেশন হয়েছিলো, পুরো শরীর অচেতন করে এই অপারেশনটা করতে হয়। এই অপারেশনটাকে বলা হয় সবচেয়ে ছোট্ট, সহজ এবং রিস্ক ফ্রি অপারেশন। অপারেশন শেষ হয়ে যাবার পরে মা'কে কেবিনে ফেরত আনা হলো। একটু পরেই জ্ঞান ফিরবে-মা স্বাভাবিক হয়ে যাবেন জেনেও বিছানার ওপর তার অচেতন শরীর দেখে আমি শিউড়ে উঠেছিলাম। আমার মা কেন একটা মুহুর্তের জন্যও অমন হয়ে থাকবে? এইসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরে দেখি এত এত মানুষ বাসায়...মা'র ঘরে ঢুকে দেখি মা ঠিক তেমনি অচেতন হয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়...।

আর ভাবতে চাই না। আর লিখতে চাই না। আর সইতেও পারি না...। পৃথিবীটা তো অবিশ্বস্তই। ২৩ তারিখটাকে, অগাস্ট মাসটাকে জীবন থেকে মুছে দিলে কি কিছু বদলে যেতো?

এখন অগাস্ট মাস এলে আতঙ্কে থাকি, কোন মানে নেই, তবুও। নিজের অজান্তে প্রতি মুহুর্তে এড়িয়ে যাই সময়টাকে। আমি যেন ঠিক আমি থাকি না। এর মাঝে দেশ থেকে খবর আসে, বাবার শরীর তেমন ভালো নেই। আমি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখি। কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসে শরীর। বাবা তুমি ভালো থাকো প্লিজ। প্লিজ বাবা।

ফুটনোটঃ সেপ্টেম্বার চলে এসেছে। ১ তারিখ থেকেই আমার মনটা খুশি খুশি হয়ে ওঠে, সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে "Happy birth month" বলে মাস শুরু করি। গতকাল বাবাকে ফোন করে জেনেছি, সব রিপোর্ট ভালো এসেছে। স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলে ভাবছি, এবার প্রিয় সচলে লিখতে না পারলেও অন্তত পড়তে তো পারব প্রিয় মানুষগুলোর লেখা।

Wednesday, July 30, 2008

কি সন্ধানে যাই সেখান আমি...

(গত কয়েক দিনের বিচ্ছিন্ন দিনলিপি)

তুমি না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হতো না
দুই তিন ধরে একটু সকালে উঠার অভ্যাস করছি। একটু হালকা নাস্তা করি, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সচলায়তনে লগ-ইন করি, পড়তে থাকি। ফেসবুকে ঢুঁ মেরে হোমপেজে বন্ধুদের আপডেট দেখি। এই-ই ভালো লাগে তবু মাঝে কিছুক্ষণ রান্নাঘরের রঙীন মশলাপাতি আর চাল-ডাল-পেঁয়াজ-রসুন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয়। ভাবছি, সকালে উঠতে পারাটা দারুণ ব্যাপার। প্রয়োজনের বাইরের কাজগুলো আয়েশী ভঙ্গিতে করে নেবার সময় পাওয়া যায়।

দেশ থেকে বই এসেছে অনেকগুলো, অনেক দিন পর নতুন বই হাতে নিলাম- কি যে আনন্দ! "সচলায়তন সংকলন" নিয়ে টুকটাক কিছু অভিযোগ শুনেছিলাম, ফন্ট বেশি ছোট হয়েছে, কাগজের মান তেমন ভালো নয়-এসব। আমার তো মনে হলো আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বইটা হাতে নিয়ে বসে আছি। কি চমৎকার প্রচ্ছদ। ক্ষুদ্র অক্ষরগুলো দেখে ভাবি আহা কি চমৎকার গুটি গুটি হরফে ছাপা। বইমেলা নিয়ে বরাবরই আমার উচ্ছ্বাস অনেক বেশি, এবারেরটা আরো অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিলো, খুব কাছের মানুষদের বই ছাপা হয়েছে বলে। আর এমন কপাল, এবারই প্রথম বইমেলায় থাকতে পারলাম না। তখন থেকেই অপেক্ষায় আছি। কিন্তু "সচলায়তন সংকলন" আজিজে খুঁজে পাওয়া গেলো না, আগেই বইমেলা থেকেই যেটা কেনা হয়েছিলো সেটাই পাঠিয়ে দিয়েছে আমার বোন। এসেছে নজমুল আলবাব ভাইয়ের "বউ, বাটা, বল সাবান", আরিফ জেবতিক ভাইয়ের "তাকে ডেকেছিলো ধূলিমাখা চাঁদ", মুর্তালা রামাতের "কষ্টালজিয়া", সুমন রহমানের "গরিবি অমরতা", "সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া"। মাঝের থেকে কেমন করে যেন অমিত আহমেদের "গন্দম" এলো না, কেনা হয়েছিলো তো ঠিকই-মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। আহমেদুর রশীদ ভাইকে এখানে একটা বিশাল ধন্যবাদ দিতেই হবে, আমার বোন খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রশংসা করলো তার। আজিজে ঘুরে আপু খানিক হিমশিম খাচ্ছিলো এই স্পেশাল বইগুলো খুঁজে পেতে। "শুদ্ধস্বর"-এ যাবার পর বইয়ের নাম শুনে রশীদ ভাই জানতে চাইলেন কাদের জন্য পাঠানো হচ্ছে। ভাগ্যিস আমি ছদ্মনামে লিখি না, তাই চিনতে পারলেন (কনফুর নাম তারেক বলাতে চিনে নাই :) )।


হিমালয়ের কাছের কিছু মানুষ
আমার কাজের জায়গায় দক্ষিন এশীয়দের মিলন বসে। আমি একজনই বাংলাদেশি এবং বাঙ্গালী। ভারতীয় আছে বেশ কিছু, একজন পাকিস্তানী, একজন শ্রীলঙ্কান, একজন নেপালী। খুব সম্প্রতি আরো দু'জন নেপালী যোগ দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া আসতে পথে প্রথম যে ভিনদেশীর সাথে আমার পরিচয় হলো, সে ছিলো একজন নেপালী, অবধারিতভাবে ভীষন সুন্দরী (আজ পর্যন্ত যত নেপালী মেয়ে দেখেছি সবাই মারাত্মক সুন্দরী, মনীষা কৈরালাকে দিয়ে শুরু!)।

বাংলাদেশ থেকে মেলবোর্ণ আসার পথে ব্যাংকক এয়ারপোর্টে ৭ ঘন্টার দীর্ঘ ট্রানজিটে একলা একলা কিছু করার ছিলো না, ছোট লাগেজটায় তাই বই ছিলো দু'টো সংগী হিসেবে- অবশ্যই ছোট গল্পেরঃ একটা আবু ইসহাকের, গত বইমেলা থেকে কেনা; আরেকটা গী দ্য মোঁপাসার। আবু ইসহাকের বইটা খুলে পড়া চলতে চলতে দেখি একটা মেয়ে হন্তদন্ত হয়ে আমার সামনে এসে থেমে গেলো। আমি বসেছিলাম সি ১ গেটের পাশে, বেঞ্চিতে। ওই গেট দিয়ে নেক্সট ফ্লাইট ধরতে হবে। জীবনের প্রথম বিদেশযাত্রায় একা থেকে, কোন ভুল করে বিপদে পড়তে চাই নি। তাই প্লেন থেকে নেমেই প্রথম কাজ ছিলো ইন্টারনেটে বসে খবর পৌঁছে দেয়া, আর তারপরেই আমার টার্মিনাল খুঁজে বের করে ধারেকাছে বসে থাকা। মেয়েটা বন্ধ সি১ গেট বেশ কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার চেষ্টা করে হতাশ হয়ে আমার পাশে বসে পড়লো। গন্তব্য কোথায় জিজ্ঞেস করতে জানায় মেলবোর্ণ। এইবার আমি বেশ একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলি, আমিও। সে খানিক ভরসা পেলেও ততোধিক দুশ্চিন্তায় বলে, আমাদের টার্মিনাল গেট বন্ধ হলে যাবো কি করে। আমি ভাবি কি পরিমান সরল একটা মেয়ে। তাকে বুঝাই তখনও আরো ৬ ঘন্টা বাকি ফ্লাইটের, গেট এখনই কেন খোলা থাকবে? এবার সে খানিক শান্ত হয়। একটু একটু করে আলাপ চলতে থাকে। নাম গীতা পন্ত। আমার মত তারও প্রথম বিদেশযাত্রা। কপালে (সিঁথিতে নয়) বেশ বড়সড় লাল সিঁদুরের প্রলেপ। জানা গেলো সে নেপালী, আসবার আগে মা পূজো করে আশীর্বাদ স্বরূপ এই চিহ্ন দিয়ে দিয়েছে। এই ৬ ঘন্টা টুকটুক করে অনেক কথাই হলো, সে খুব চিন্তিত তার দুর্বল ইংরেজী নিয়ে। মেলবোর্ণ পৌঁছেই আগে ইংরেজী শেখার কোন কোর্স করবে ঠিক করেছে। এক ফাঁকে গীতা তার ব্যাগ থেকে বেশ কিছু চুড়ি বের করে আমাকে দিলো স্মৃতি হিসেবে। আমি মোটামুটি ভ্যাবলা হয়ে দেখি তাকে দেবার মত এরকম কিছুই নেই আমার কাছে। বাংলা সাহিত্য তো আর দেয়া যায় না! মেলবোর্ণ আসার পাঁচ মাস পর হঠাৎ একদিন রাস্তায় দেখা হলো আবার গীতার সাথে, ফোন নাম্বার পেয়েছি-তবু যোগাযোগ হয় না।

গীতার কারনেই নতুন আসা নেপালী মেয়েটাকে দেখে খুব খুশি হলাম। ইনিও মাশাল্লাহ সুন্দরী, আমার চেয়ে অনেক ছোট বয়সে, নাম রেটিনা। প্রথম ক'দিন খুব মন খারাপ করে থাকতো। কাজের মাঝে বিরতিতে নানাভাবে তার মন ভালো করার চেষ্টা করতে করতে বলি, এখানে আরেকজন নেপালী ছেলে আছে, মানীশ। আবার মানীশকেও বলি, নতুন একটা নেপালী মেয়ে এসেছে। শুনেই ভারতীয় ছেলেগুলো মানীশকে ক্ষেপানো শুরু করলো, মানীশ তো গার্লফ্রেন্ড পেয়ে গেলো। দু'দিন পর দেখা গেলো সত্যিই তাদের খুব ভাব হয়ে গিয়েছে। বেশ একটা আজব অনুভূতি হয়, দু'জনের মিল করিয়ে দিয়েছি ভেবে।


মায়াবতী দিদি আমাদের
সূচেতা দিদির বাসার এলে কেমন যেন ছেলেমানুষ হয়ে যাই একটু বেশি। এখানে সবাই খুব বেশি বড় হয়ে যেতে চায়, স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েগুলোরও ইউনিফর্ম না পড়লে বয়স বুঝার উপায় নেই। আর সেখানে আমি তো জীবনের দুই যুগ পার করে আরো এগুচ্ছিই ক্রমাগত। বড় বড় ভাব নিতে হয়। নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে হয়। অন্যদের সাথেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হয়। নয়ত আর কি?এখানে কোথায় পা'ব বাবাটাকে। কোথায় পা'ব পাশের বাড়ির প্রিয় খালাকে...কে করবে ছেলেমানুষ ভেবে অনেক বেশি আদর আর সেইসাথে শাসন? এই একজনই আমাদের, সূচেতা দিদি। এই এখন দিদির বাসায় এসে দিদি খাবার-দাবার রেডি করছে আর আমি দিদির পিসি কিবোর্ডে হাত চালাচ্ছি। অন্য যেকোন বাসায় গেলে নির্ঘাত বেশ দায়িত্বশীল ভাব নিয়ে রান্নাঘরে আর খাবার টেবিলে সাহায্য করতে যেতাম। মাত্রই দিদি খানিক ভর্তসনাও করে গেলেন কম্পিউটারে এডিক্ট হয়ে গিয়েছি বলে। এই একটুখানি বকাও যে কত ভালো লাগে! এখন বকা খাচ্ছি, একটুপরে খাবো খিচূড়ী। আহা নিজে না রেঁধে খেলে খিচূড়ীর মজা যে কতখানি বেড়ে যায়!

দিদির বাসায় টুকটুক করে কত কি সাজানো। দু'টো ঘোড়া আছে, দারুণ। একটার পিঠে আবার জিনও আছে, আছে পা রাখার জায়গা, যেন এক্ষুনি কেউ ওতে পা রেখে ওর পিঠে চড়ে বসবে, তারপর টগবগ টগবগ...। অথবা যদি ওর একটা ডানাও থাকতো পক্ষিরাজের মত! সবার অলক্ষ্যে আমি কি ঘুরে আসতে পারতাম আমার সবুজ দেশটা?

পাগলা ঘোড়া রে, কই থেইকা কই লইয়া যাস...
আমার ব্যাচের পোলাপানের মাস্টার্স শেষ হলো মাত্র ক'দিন আগে ঢাকা ইউভার্সিটিতে, থিসিস-এর কাজ চলছে। ই-চিঠিতে যোগাযোগ হয় এক বন্ধুর সাথে। ভালো রেজাল্ট হবে তার সন্দেহ নেই, তাই পরামর্শ দিই মাস্টার্স-এর পরে বাইরে কোথাও পড়তে যাবার, স্কলারশীপের জন্য যেন চেষ্টা করে। সে-ও জানায় তাই ভাবছে। তারপরের লাইনটাই চমকে দেয় খুব- "অদ্ভুত তুই বাইরে গিয়ে ভাবছিস দেশে কবে আসবি আর আমি দেশ থেকে বাইরে যাবার কথা ভাবছি। এজন্যই মুজতবা আলী বলেছিলেন, বাঙ্গালীরা বড় বেইমান প্রকৃতির, কখনও দেহমনের সহাবস্থান করতে জানে না..."।

কি অদ্ভুর নিয়ম। আমরা যা ইচ্ছে তাই করছি ভেবেও আসলে কি দারুণ পুতুল হয়ে বসে আছি প্রকৃতির। ইচ্ছেগুলোও কি দারুন বদলে দেয় একেকটা পরিবর্তিত পরিস্থিতি। প্রবাসে কনকনে ঠান্ডায় নিজেকে নানান শীতবস্ত্রে ড়্যাপিং করে, দারুন ভালো গতির ইন্টারনেটে এখানে সেখানে ঘুরে অতঃপর নিজের পাতায় টাইপ করতে করতে লক্ষ্য করি আজ ২৯শে জুলাই। ঠিক একটা বছর হয়ে গেলো এই ভিনদেশে! দীর্ঘ ৩৬৫ টা দিন!! তবুও দেহমনের সহাবস্থান করা হলো না।

Thursday, July 17, 2008

"সচলায়তন" নিয়ে উদ্বেগ

সমস্যা কিছু একটা হয়েছে- কি সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এই ধোঁয়াশার মাঝে পড়ে মনে হচ্ছে, আমাদের অতি প্রিয় "সচলায়তন" ব্যান করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে!

নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সচলায়তন সাইটের নির্মাতারা যথেষ্ট ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা সাধারন ব্লগার-লেখক-পাঠকরা অস্থির হয়ে আছি, কিন্তু তারা নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলছেন না। কিন্তু এটা নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে বাংলাদেশ থেকে www.sachalayatan.com সাইটে ঢোকা যাচ্ছে না। মূল সার্ভারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে, সেখানে তো কোন সমস্যা নেই! এবং বাংলাদেশ ছাড়া আর অন্য সব দেশ থেকেই সচলায়তনে ব্রাউজ করা যাচ্ছে। কাজেই এটা অবশ্যই সাধারণ টেকনিকাল সমস্যা না। তো?

কেন এরকম হচ্ছে বুঝছি না। কেমন গোমট বেঁধে আছে সব। কোন কিছুতে মন বসানো যাচ্ছে না। মনে প্রানে চাইছি যা ভাবছি তা সত্যি না হোক। কিন্তু সেই সম্ভাবনাই যে প্রবল! বাংলাদেশ কোন পথে এগুচ্ছে তাহলে? ইন্টারনেটে বসে মুক্তমনে নিজের কথাগুলো বলাও কি বন্ধ করার পাঁয়তারা চলছে?

খুব দ্রুত অবসান ঘটুক এই ধোঁয়াশার। আমাদের ভীষন প্রিয় "সচলায়তন" আগের মত সচল হয়ে উঠুক বাংলাদেশে।

------------------------------------------------------------------------------
অনেক অনিশ্চয়তা এবং প্রশ্নের পরে এই মুহুর্তে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে যে, বাংলাদেশে "সচলায়তন"-এর দু'টি পোর্ট ব্লক করা হয়েছে।

Monday, July 07, 2008

কোলের ওপর...:-)

আজব একটা সময় কাটাচ্ছি। না আসলে সময়টা আজব বলা ঠিক হচ্ছে না, সময় তো একই আছে, আমি সামহাউ আজব হয়ে আছি। কারন এখানে লিখব না। তবে অন্য কিছু লিখি। লিখলে এক ধরনের আরাম হয়। এই আরামটা এখন আমার খুব দরকার।

আমি মনে হয় ল্যাপটপে বসে জীবনেও লিখি নাই এর আগে, আজকে খুব মজা লাগছে কোলের ওপর জিনিসটা ফেলে লিখতে। এটা তারেকের পুরনো ল্যাপটপটা। নষ্ট হয়েছে ভেবে আরেকটা কেনার বেশ কিছু দিন পরে টের পাওয়া গেলো যে আসলে পুরানটার সমস্যা খুব গুরুতর না, শুধু হার্ডড্রাইভ বদলে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিরম লাগে? তাইলে কেন নতুনটা কেনা হলো? এখন আবার খালি খালি আগেরটার জন্য হার্ডড্রাইভ কিনে কি হবে? কিচ্ছু হবে না, তাও আমরা কিনে ফেললাম। এরকম অদরকারী কাজের একটা আলাদা মজা আছে। দুম করেই কেনা হলো। আগের দিন কি ভেবে তারেককে বললাম, "আমাকে একটা হার্ডড্রাইভ কিনে দিবি নাকি পুরান ল্যাপটপটার জন্য"? আমি কিছু চাইলে এই ছেলে বেশ খুশি হয়। একগাল সরল হাসি দিয়ে বললো, "তাই? আচ্ছা দাঁড়া"। পরের দিন তার কাজ চারটা পর্যন্ত, সে ১টার সময় ফোন করে বলে, "ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে একটা সোয়াপ মার্কেট বসেছে চারটা পর্যন্ত। আমি কাজ থেকে আজকে আগে ছুটি নিচ্ছি। ২টায় বাসায় আসছি, রেডি থাকিস"। অতঃপর মাত্র ৭০ অস্ট্রেলিয়ান ডলারে ১৬০ গিগাবাইট মেমোরির একখানা হার্ডড্রাইভ কেনা হলো।

পুরান জিনিস ইউজ করে ক্যান জানি আমি অন্য রকম একটা মজা পাই। স্কুলে পড়ার সময় ছোট আপুর পুরানো বই পড়েছি অনেক। আপুরগুলো আগে পড়তাম, তারপর কিছুদিন পরে নতুন বই কেনা হতো। আমি নতুন বইগুলোর গন্ধ নিতাম, আর আপুর পুরানগুলো পড়তাম! ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তো প্রায় সবাইই পুরানো বইয়ের ভক্ত হয়ে যায়। মূল কারণটা অর্থনৈতিক এবং বইয়ের মান, দুইটা মিশ্রিত। কারন নতুন বইগুলো সাধারণত হত ফটোকপি, মান ভালো ছিলো না। ওদিকে পুরানো বই পাওয়া যেতো কিছু যেগুলো আসল কপি কিন্তু পুরানো। সেগুলো ডেফিনিটলি অনেক বেশি আকর্ষনীয় ছিলো। তো, এখন এই পুরনো ল্যাপটপ ল্যাপে বসিয়ে বেশ সেরকম একটা অনূভুতি হচ্ছে আমার। এটা পুরনো হলেও তারেকের নতুনটার চেয়ে মানে ভালো। :-)

ল্যাপটপে লেখা উদ্বোধন করতেই আজকে লিখছি। কিন্তু কাহিনী হচ্ছে, লিখতে চেয়েছিলাম চা-কফি বিষয়ক আমার প্রেম-ভালোবাসার কথা, আর লিখে ফেললাম কি? তাতে সমস্যা অবশ্য কিছু নেই, ওই নিয়ে নাহয় আরেক দিন হবে।

Friday, June 13, 2008

পারি না

অসংখ্য মানুষ। এই শহরে এত মানুষ একসাথে আমি কখনও দেখি নি। কিছু একটা গড়বড় হয়েছে নিশ্চয়ই। ভাবার সময় নেই, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে অফিসে পৌঁছুতে হবে। ডানে ঘুরতেই পুলিশ থামায়, যাওয়া যাবে না। আমি অবাক, হাত দিয়ে সামান্য দূরেই দেখিয়ে বলি, "আমার অফিস ওই তো, পাঁচ পা হাঁটলেই"। "না না, যাওয়া যাবে না, অন্য রাস্তায় যাও"। আমি বুদ্ধি করে রাস্তায় অন্য পাশে যাই, না সেদিক দিয়েও রাস্তা বন্ধ। এবার একটু ঘাবড়ে যাই। এই দেশে বেশি দিন হলো আসি নি, সিটির চেনা জায়গা বলতে আমার এই অফিসখানাই। বাসে করে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নেমে নির্দিষ্ট দু'টি পথ পেরিয়ে আমার অফিস। এর অন্যথা হলেই আর জানি না।

ক'জন পুলিশকে জিজ্ঞেস করি, কোন দিক দিয়ে ওখানে যাওয়া যাবে। প্রথম দু'জন ডিউটি নিয়ে ভীষন ব্যস্ত, আমাকে সময় দিতে অপারগতা জানালো। তৃতীয় এবং চতুর্থজন খানিকটা নির্দেশনা দিলো, একই রকম। ভাবলাম পেয়ে যাবো। কিন্তু ভাবলেও আমি জানি, কাজ হবে না- আমি আসলে পারবো না। রাস্তা আমি কখনও ভালো করে চিনি না। একই রাস্তা দিনের পর দিন, এমনকি বছরের পর বছর ক্রমাগত গেলেও ভুল করে ফেলি তবু। ছোটবেলায় বাড়ি থেকে স্কুলের পথ ভুল করেছি কত, অথচ এইটুকুনি পথ ছিলো সেটা। কখনও কোথাও একা গেলেই সব হারিয়ে ফেলতাম, একা কখনও ছিলামও না অবশ্য, মা ছিলো না সাথে সব সময়? নয়ত ছোট আপু, নয়ত বড় আপু, নয়ত বাবা। মফস্বল থেকে যখন ঢাকায় যাই, কতবার ভুল করে কার্জন হল পেরিয়ে রিকশা নিয়ে চলে গেছি পুরান ঢাকার দিকে। কিন্তু পরিবার থেকে দূরে গেলেও পরম বিশ্বস্ত বন্ধুর হাত পেয়ে গিয়েছি সেখানেও। চোখ বন্ধ করে পরম নির্ভরতায় পার হয়ে গেছি কত শত মাইল, সেই হাত ধরে। মফস্বলের এই আমার ঢাকা শহরের হালচাল খানিক বুঝতেই কেটে গেলো কতগুলো বছর। হায়, এই বিদেশ বিভুঁইয়ের হালচাল বুঝতে কতদিন লাগবে কে জানে?

ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাবার মুখটা খুব মনে পড়ে। বাবার হাতটা ধরতে ইচ্ছা করে...। ওমনি মোবাইলে অর্ণব গেয়ে ওঠে, "তোমার জন্য নীলচে তারার একটুখানি আলো"...তার বিশেষ রিংটোন, ভীষণ চিন্তায় আছে, আমি হারিয়ে যাই কিনা ভেবে। "তুই মাথা ঠান্ডা কর, আমি বলে দিচ্ছি কোন দিক দিয়ে গেলে পাবি।" ও খুব সুন্দর করে রাস্তা বলে দেয় আমাকে...কিন্তু আমি কিছুই বুঝি না। এবার সত্যি খুব অসহায় লাগে আমার। এত্তগুলো মানুষের মাঝখানে নিজেকে খুব বেশি একলা মনে হয়। সে আবার ভরসা দেয়, "মাথা ঠান্ডা কর, আমি আবার বুঝিয়ে বলছি।" কিন্তু জটিল পরিস্থিতিতে মাথা আমার কখনই ঠান্ডা হয় না। বরং আরো জেদ চেপে যেতে থাকে। কেন আমার সব সময় এমন হয়? কেন আমি সব ভুল করি? আমি খুব রাগী রাগী গলায় তাকে ঝাড়ি দিই, " তোর কথা কিছু বুঝছি না আমি, আমাকে একটু নিজে নিজে খুঁজতে দে। আমি পাঁচ মিনিট পরে ফোন করি তোকে।" বলে ফোন কেটে দিই। ও খুব ভালো করে জানে রাস্তা খুঁজতে গিয়ে আমি উল্টো সব হারিয়ে ফেলব। কিছুক্ষন পরেই আবার ফোন ওর। আমার কেন যেন কথা বলতে ইচ্ছা করে না। ফোন কেটে দিই। আবার ফোন। আবার। আমার মনে হয়, আমি কারো কথায় কিছু বুঝব না, আমার মাথায় যে ওসব কিছুই ঢুকছে না। আমি শুধু জানি, বার্কস স্ট্রিট, কলিন্স স্ট্রিট, ফ্লিন্ডারস লেন। এর বাইরে সব কেমন গুলিয়ে-পেচিয়ে কিলবিল করে আমার মাথায় ঘুরতে থাকে।

আবার আমার দেশের কথা মনে হয়, মা'র কথা, "মামণি, সাবধানে রাস্তা পার হয়ো!" ছোটআপুর কথা মনে হয় যে আমার হাতটা বড় আদর নিয়ে ধরে রেখেছে যেন হাঁটতে হাঁটতে। আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। এ শহর আমার নয়। এই শহরের মানুষদের আমি চিনি না...সারি সারি গাড়ি, ট্রাম, বাস, বাইসাইকেল--কোনকিছুই আমার আপন নয়। ঠিক কোন পথ ধরলে ফের অফিসটা খুঁজে পাবো জানি না। আমার হঠাৎ করে কেন যেন জানতেও ইচ্ছা করে না। ক্রমশ একলা-অসহায় লাগতে থাকা অনুভূতিকে আমি ইচ্ছে করেই বাড়তে দিই। আমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। চোখ বন্ধ করি। দু'পাতায় চাপ লেগে জমে থাকা পানির একটি ফোঁটা টুপ করে পড়ে আমার গাল বেয়ে অচেনা পরিচ্ছন্ন রাস্তায়। আমি হাঁটতে শুরু করি, কোন দিকে নিয়ে যাবে এই পথ জানা নেই।

------------------------------------------------------------------------------------------
না, হারিয়ে যাওয়া আমার হয় না। ভালোবাসার পিছুটান আবার ঠিকই হাতটা ধরে ফেলে।

Friday, May 23, 2008

রাহেলা

--রাহেলা,অজুর পানিটা দিয়ে যাও তো।

হঠাত ডাকে সচকিত হন রাহেলা বেগম। জমে যাওয়া পায়ে ধীর গতিতে হেঁটে যান স্বামীর কাছে। অপলক তাকিয়ে থাকেন। ভুলে যান স্বামীর আদেশ। ফের ডাক পড়ে।

-- কি দেখো তাকিয়ে, কথা কানে যায় না? সারা দিন কোন ধ্যানে যে থাকো? আমার প্রথম বউ তো এরকম বেয়াদবী আমার সাথে কখনও করে নি। তোমরা আজকালকার মেয়েছেলে ...

রাহেলা নিজের অপরাধের মাত্রা বোঝেন। শান্ত গলায় বলেন,
-- আজকে শরীলটা ভালো নাই, তাই কাজে ভুল হয়ে যাচ্ছে, কিছু মনে কইরেন না। আমি এক্ষনি পানি আনছি।

রাহেলা ওজুর পানি স্বামীর সামনে রাখতেই টান পড়ে হাতে।

-- কি করেন? ছাড়েন। এখন না নামাজ পড়বেন!

রোমান্টিক হবার চেষ্টা ব্যর্থ হতে দেখে জামাল সাহেব বোঝেন অল্প বয়েসী বউয়ের সাথে কঠিন করে কথা বলাটা ভুল হয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামাজে বসেন তিনি।

রাহেলা বেগম রান্নাঘরে ঢুকে আবার নিজের চিন্তার জগতে ডুব দেন। আজ তার কি যে হলো ... কেবল পুরনো কথা গুলো এসে ভীড় করছে মনের মধ্যে। চুলায় ভাত ফুটতে থাকে ...

রাহেলা বেগম এক নিমিষে "রাহু" হয়ে ভাবতে থাকেন একই সাথে সুখ অথবা দুঃখ স্মৃতি।

সুন্দরী রাহেলা। নিজের প্রতি সবার আকর্ষন খুব ভালো করেই টের পায়। সৌন্দর্যের অহংকারে তাচ্ছিল্যে এড়িয়ে চলে সকলকে। কিন্তু কি করেই যেন ভালো লেগে গেলো বড় ভাইয়ের এক বন্ধু, আরমানকে। কি হ্যান্ডসাম দেখতে! তার মত সুন্দরীর জন্য যোগ্য পাত্র আর কে হতে পারে? চুরি চুরি প্রেমে বেশ কেটে যাচ্ছিলো দিন।

কিন্তু একদিন ধরা পড়তেই হলো আর সাথে সাথেই কড়া হুমকী বড় ভাইয়ের "আর কোন দিন ও পথে পা বাড়িয়েছিস তো ... কেন বুঝিস না ও ভালো ছেলে না মোটেই"!

সতেরো বছরের মন ছিলো অস্থির-চঞ্চল, বাসার কেউ মানবে না আগে থেকেই জানত সে। এদিকে আরমানও তাগাদা দিচ্ছিলো। রাহেলা মনস্থির করার জন্য আর বেশি সময় তাই নিলো না। বিয়ে করে ফেললো পালিয়ে। বাপের বাড়িতে আর ফেরা হলো না তার, এক রকম অবাঞ্ছিতই করা হলো তাকে।

রাহেলা প্রবেশ করলো তার নিজের নতুন সংসারে। তার স্বামী আরমান অনাথ। এক সময় অবস্থাসম্পন্ন পরিবার ছিলো যার চিহ্ন রূপে রয়ে গিয়েছে বিশাল বাড়িটা। একমাত্র বোনটার বিয়ে হয়ে গিয়েছে গত বছর। খালি বাড়িতে রাহেলা একেবারে নিজের মত করে শুরু করলো তার সাধের সংসার। বিয়ের ঠিক পরের কটা দিন কেটে গেলো স্বর্গের মত সুখে।

কটা দিন, মাত্রই হাতে গোনা কটা দিনই। এরপর রাহেলার স্বপ্নের হ্যান্ডসাম নায়কের ভিলেনের মত রূপ বেরিয়ে এলো। পারিবারিক ব্যবসা করছে বলে যে কথা বিয়ের আগে বলেছিলো আরমান তার সবটাই মিথ্যা বলে জানা গেলো। সেই সাথে শুরু হলো কিছুদিন আগে বড় ভাইয়ের মুখে শোনা কথাগুলোর বাস্তবায়ন। অনেক রাতে মদ্যপ হয়ে বাড়ি ফেরা, কখনও বা না ফেরা, খারাপ পাড়ায় যায় বলেও শোনা যায় মানুষের মুখে। সবটা রাহেলা বিশ্বাস করে না। অনেক রাত অবধি একলা ঘরে ভয়ে ভয়ে স্বামীর জন্যে অপেক্ষা করে। এক সময় শ্বশুরের রেখে যাওয়া ব্যাংক ব্যালেন্স ফুরিয়ে যেতে থাকে। একে একে ঘরের জিনিস বিক্রি করেও সামলানো যায়না নিত্য দিনের চাহিদা।

দিনের পর দিন রাহেলা চেষ্টা করে যায় স্বামীকে শোধরাবার। কিন্তু দিনগুলোই কেটে যায় কেবল, বদল হয় না কিছুই। সব দেখে শুনে রাহেলা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, বিশ্বাস হয় না সত্যি এমন ঘটে চলেছে তার জীবনে। আরও কিছু দিন যায়, এরই মাঝে ফুটফুটে এক মেয়ে জন্ম নেয় তাদের ঘরে। রাহেলা তাকে বুকে চেপে রাখে। সব ভুলে তাকে অবলম্বন করে বাঁচতে চায়। কিন্তু সেই অবলম্বনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নতুন অশান্তি। কেন? না, সে যে মেয়ে! হোক শিশু, মেয়েমানুষ তো!

মেয়ের বয়স বাড়ে - এক বছর, দুই বছর করে তিন বছর, কিন্তু বাড়ে না শরীর। অপুষ্টিতে রুগ্ন হয়ে যাওয়া ছোট্ট শরীর। রাহেলা আর্তনাদ করে স্বামীর কাছে বলে,

-- একটা কিছু কর, এইভাবে বসে থেকে থেকে না খেয়ে না দেয়ে আমাদের হয়তো আর কিছুদিন জীবন কেটে যাবে, কিন্তু এই শিশুটার কথা ভাবো, সে আমাদের সন্তান’!

আরমানের মদের গন্ধওয়ালা মুখ থেকে অদ্ভুত কিছু শব্দ বেরোয় জবাবে। অস্ফুটে বলে,

--হুঁ ... সন্তান ... মেয়ে বাচ্চা দিয়ে আমার তো কোন কাজ নেই...তোমার থাকলে তুমিই কাজ করে খাওয়াও না তোমার মেয়েকে ।

রাহেলার মুখে কথা সরে না। দিন দিন কতখানি অমানুষ হয়ে উঠেছে তার স্বামী স্পষ্ট বুঝতে পারে। নিজের জন্য নয়, কোলের শিশুটার কচি মুখের দিকে তাকিয়ে হাহাকার করে উঠে তার বুকের ভেতরটা। বড় অভিমান হয় নিজের ওপর। কেন বাবা-মা’র কথা না শুনে সে বিয়ে করেছিল এই অমানুষটাকে? কেন তার আর পড়ালেখা করা হলো না? যে মেয়ের জন্য পাগল হয়ে ছিল এত মানুষ, আজ তার জীবনের এই দশা! রাহেলার চোখ থেকে ক্রমাগত অশ্রু ঝরে পড়তে থাকে। শত শত প্রশ্নে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। নিজের হাতে একটা টাকা নেই। রাহেলা বাস্তবিকই কি করবে খুঁজে পায় না। হঠাত মনে পড়ে বাবার বাড়ি থেকে চলে আসবার সময় নিয়ে আসা মায়ের কিছু গয়নার কথা, নিজের ছোট্ট ট্রাংকটায় তালা মেরে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। দৌড়ে ট্রাংক খুলেই থম হয়ে যায়। নেই!

রাহেলা এক নিমিষে বুঝে ফেলে কি ঘটেছে। মাথায় রক্ত উঠে যায় তার। ভেবে পায় না একটা মানুষ কোন পর্যায়ে গেলে নিজের বউ আর বাচ্চাকে না খাইয়ে নিজের ফুর্তির টাকা যোগায়। আজ একটা কিছু রফা করবেই স্বামীর সঙ্গে। গোঁজ হয়ে বসে থাকে আরমানের ফেরার অপেক্ষায়। রাত বাড়ে। এক সময় আরমানের খটখটি শোনা যায়। দরজা খুলে রাহেলা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না, আরমান একা নেই। নিজের সঙ্গে আরেকজন মেয়ে নিয়ে এসেছে! লোকমুখে শুনেছিলো কিন্তু এই কথাটা রাহেলা কখনো বিশ্বাস করে নি। আজ আরমান অনেক শান্ত মেজাজে আছে, ঠান্ডা মাথায় ঠান্ডা গলায় দ্বিধাহীনভাবে রাহেলাকে তাই বলতে বাধেনা,

-- আমি অনেক ভেবে দেখেছি তোমার আমার সংসার করার আর কোন দরকার নাই ... রোজ রোজ তোমার জ্ঞানী জ্ঞানী উপদেশ শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত। আমি নিজের জীবনের তালই রাখতে পারি না আরো বাড়তি দুইটা মানুষ! শোন রাহেলা, তোমার মেয়েকে নিয়ে তুমি কালকে চলে যাবা তোমার বাপের বাড়ি। আমি একলা শান্তিতে, ফুর্তিতে জীবন কাটাবো। বিশেষ দরকার হলে আমার ময়নাপাখীদের এইখানে আমার বাসায় নিয়ে আসবো।

সাথের মেয়েটিকে রাহেলার সামনেই জড়িয়ে ধরে পাশের ঘরে ঢুকে যায় আরমান। রাহেলার মুখে কোন কথা সরে না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে স্বামীর চলে যাবার দিকে। অবিশ্বস্ত, বড় অবিশ্বস্ত মনে হয় পৃথিবীটাকে। কতটা সময় চলে গেছে খেয়াল হয় পাশের ঘরের আওয়াজে। চটকা ভেঙে পাথর রাহেলা ছুটে যায় মেয়ের দিকে। নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জাপটে ধরে তাকে, ভেঙে পড়ে মেঝের ওপর ঝড়ে ওপড়ানো গাছের মতো। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। সমস্ত শক্তি নিশেঃষিত হলে একের পর এক বিভীষিকা চোখের ওপর ভাসতে থাকে। পাশের ঘর থেকে হাসির শব্দ খান খান হয়ে ছড়িয়ে পরে অন্ধকারে।

কেমন করে কেটেছিলো ওই বিভতস রাত, আজ ভেবে তার কোন কূল পায় না রাহেলা। পরদিন সকাল হবার সাথে সাথেই ছুটে গিয়েছিলো বাপের বাড়িতে। সংসার ভাঙ্গার জন্য কোন কষ্ট নয়, বাস্তবিক সে যেন মুক্তি পেয়েছিলো অসুস্থ এক জীবন থেকে। বহুদিন পর নিজের চেনা পরিবেশে বাবা-মা আর ভাইয়ের সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কথা বলে সে। ছোট্ট মেয়ে নীলা বড় হতে থাকে একটু একটু করে। তারও কিছুদিন পর ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে সে কি আনন্দ রাহেলার! কদিনের জন্য ভুলেই যায় নিজের অভিশপ্ত জীবনের কথা। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়,নতুন ভাবী আসে ঘরে। বিয়ে উপলক্ষ্যে পাওয়া আনন্দ বেদনায় পরিণত হতে সময় লাগে না খুব বেশি দিন। নতুন ভাবীর নিত্য খোটা ছন্দপতন ঘটাতে থাকে দিনযাপনে। নিজের বাবার বাড়িতে প্রতি পদে পদে অপমানিত হতে হতে রাহেলার জীবন আবার দুর্বিষহ হয়ে উঠে। ইচ্ছা করে আবার পড়াশোনা করে চাকরী করে বাঁচতে। মেয়েটাকে যেন তার মতো অবস্থায় না পড়তে হয়। কিন্তু পড়ার খরচটাই বা দিবে কে?

অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়, এইখানে এইভাবে আর নয়। কিছু একটা করবে। কিন্তু কি যে করবে তাই ভেবে পায় না। একদিন ভাইয়ের ঘরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ভাবীর কথা কানে আসে। তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। অবাক হয় রাহেলা। একটু পরেই বুঝতে পারে আসল ঘটনা। পয়ষট্টি বছরের এক বিপত্নীক বৃদ্ধ-- তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে, সবাই বিবাহিত। ভাবী চাইছে এই বিয়েটা দিয়ে আপদ বিদায় করতে। রাহেলা নিজের মনে কিছুক্ষন ভাবতে থাকে। পয়ষট্টি বছর! এ যে বাবার বয়েসী। তবু তো সেখানে তার নিজের সংসার হবে, মেয়ের ভবিষ্যতের একটা ব্যবস্থা হবে। রাহেলা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। একটাই কেবল শর্ত থাকবে এই বিয়েতে রাজী হবার, তার মেয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। এই শর্তে নিঃসংগ বৃদ্ধের আপত্তির কোন কারন ছিলো না। বিয়েটা হয়ে গেলো তাদের।

আবার সংসারে প্রবেশ করলো রাহেলা। বহুদিন পর কর্তৃত্ব হাতে পেলো। তার ছয় বছরের ছোট্ট মেয়েটিকে নতুন স্বামী অনাদর করলো না মোটেই। নিজের ওই বয়েসী নাতি আছে, সমস্যা কি! নতুন চার ছেলেমেয়ের সাথে পরিচিত হলো রাহেলা। ছোট মেয়েটা ছাড়া বাকি প্রত্যেকেই তার চেয়ে বয়েসে অন্তত পাঁচ-ছ বছরের বড়। ছোটটা তার সমবয়েসী। বড় ছেলে একমাত্র খুশি হলো বাপের বিয়েতে, বাপের সাথে থাকার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলো যে সে! কিন্তু বাকি ছেলেমেয়েরা বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে তাকায় রাহেলা আর তার মেয়ের দিকে। তাদের মন রক্ষা করার জন্য কি করবে ভেবে পান না রাহেলা বেগম। এটা রাঁধেন, সেটা রাঁধেন। সারা দিন তাদের খেদমতেই পার করে দেন। অবশেষে "খালা" সম্বোধনের সম্মান পান তিনি মেয়েদের কাছ থেকেও। বাপের বিয়ের পরের কটা দিন ভাব গতিক বুঝে একদিন ছেলেমেয়েরা চলে গেলো যার যার নিজের বাড়িতে।

রাহেলা নিজের সংসার পেলেন পরিপূর্ণভাবে। না, তার কোন অভিযোগ নেই বৃদ্ধ স্বামীর উপর। আগের স্বামীর সাথে তুলনা করলে রীতিমতন ফেরেশতা বলা যায়। কেবল কিছু বাড়তি শাসন, সেগুলোও গায়ে মাখেন না রাহেলা বেগম। বরং স্বামীর পরামর্শে এখন বোরকা পরেন, পান খান যাতে বয়সটা একটু বেশি মনে হয় লোকের কাছে। আবার তারই পছন্দে চোখে কাজল পরেন ঘরের ভেতর! একসাথে টিভি দেখেন। মজা আর রোমান্সও করার চেষ্টা করেন।

রাহেলা বেগমের ছোট্ট মেয়ে নীলা প্রথম কদিন এই নতুন বাড়িতে তাদের অবস্থান ঠিক বুঝে উঠতে পারে নি। তাকে শেখানো হলো নানার মত দেখতে এই লোকটাই এখন থেকে তার বাবা, ধীরে ধীরে সে বুঝে নিলো এটা এখন তাদেরই বাড়ি। সে তার ইচ্ছামত ঘোরে ফেরে। স্কুলে যায়, কেউ তাকে কিছু বলে না, কেবল তার নতুন বাবার বড় বড় ছেলে মেয়েগুলো এ বাড়িতে এলে তাকে খুব চুপচাপ থাকার নির্দেশ দেয় তার মা। রাহেলার ভয় কোন দিন যদি তাকে বাড়তি মনে করে ঝেড়ে ফেলে দিতে বলে তারা! রাহেলা ভাবে কোনভাবে যদি তার নামে বুড়োর কাছ থেকে কিছু সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়া যেতো। কবে দুম করে মরে যাবে তখন কি আর এই ছেলেমেয়েরা তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখবে? ভেবে ভেবে মেয়েদের আর বুড়ো স্বামীকে পটানোর নতুন বুদ্ধি করতে থাকেন তিনি মনে মনে...।

সহসা পোড়া গন্ধে চমকে ওঠেন রাহেলা বেগম। ইশ, ভাতটা লেগে গেলো হাঁড়ির তলায়। রান্না শেষ। নতুন করে আর রান্না না করে এই ভাতটাই খাবেন ঠিক করলেন তিনি, নইলে যে দেরী হয়ে যাবে। সদ্য রাঁধা ভাতের দিকে তাকিয়ে রাহেলার হঠাত মনে হয়,এই তো বেশ দেখতে - সাদা, কেবল একটু পোড়া গন্ধওয়ালা!

--------------------------------------------------------------------------
অনেক পুরনো লেখা, এখানে তুলে রাখলাম আজ। অনলাইন ম্যাগাজিন বীক্ষণ-এ প্রথম প্রকাশিত, সামান্য পরিবর্তিত।

Thursday, May 08, 2008

২৫শে বৈশাখ


পার্থিব সমস্ত অনুভূতির শেষ ভরসা তিনি একজনই- সকল আশার, সকল নিরাশার, যত ভালোবাসা, যত ঘৃণা, যত ভক্তি, যত শোক, যত উচ্ছ্বাস, যত শান্তি এবং পরিপূর্ণতা। হৃদয়ের সমস্ত বিতর্ক অবশেষে এইখানে এই শান্তিময় মহাপুরুষের কাছে এসে থেমে যেতে বাধ্য। "গীতবিতান"-এর পাতায় পাতায় একে একে সব সমাধান লিখে গেলেন তিনি অবলীলায়। মানুষের গভীরতম আবেগকে পরম যত্নে গেঁথে দিলেন সুরের মালায়। সৃষ্টি হলো অমর এবং চির আধুনিক গান। কত্তো বড় জাদুকর তুমি কবিগুরু, সব জেনে বসে আছো!

বাংগালীর আজ বড় সৌভাগ্যময় দিন, ২৫শে বৈশাখ। আমার সামর্থ মাত্র এই ক'টা লাইন। তাই সম্বল করেই তোমায় প্রণতি জানাই গুরু।

Wednesday, April 30, 2008

বন্ধু

সূর্য ডুবে যাবার অল্প কিছু সময় পর থেকে বারান্দায় এসে বসে আছেন জামাল সাহেব।

বয়স বাড়ছে আর প্রতিটা দিনের দৈর্ঘ্য বুঝি বেড়ে যাচ্ছে সমানুপাতিক হারে। অবসর নেবার পর এই সাড়ে তিন বছরে ধীরে ধীরে শরীরটায় কেমন বুড়ো বুড়ো একটা গন্ধ টের পান তিনি। স্ত্রী মনোয়ারা বেগম গত হয়েছেন প্রায় পাঁচ বছর। এখন হাতে থাকা অফুরন্ত সময়ের অধিকাংশই কাটে অলসভাবনা আর বিগত দিনের দেনা-পাওনার হিসেব কষে। আর সময়ের সাথে সাথে সবার থেকে একটু একটু করে আলাদা হয়ে যেতে থাকেন তিনি।


জামাল সাহেবের তিন ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে আর মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, ছোটটি কলেজে। তিন ছেলেমেয়ে আর জামাল সাহেব ছাড়া এই বাড়িতে শেষ সদস্যটির নাম বাদশা- তাদের বাসার কাজের ছেলে। এক বছর আগে তিনি বাদশাকে পেয়েছিলেন কাঁচা বাজার করার সময়। সাত/ আট বছরের ছেলেটা রোজ তার বাজারের ব্যাগ টেনে দিতো। কাজ শেষে বখশিশ পেয়ে তার মুখ ভরে উঠতো নির্মল হাসিতে। টুকটাক কথায় জানা গিয়েছিলো তিনকূলে তার কেউ নেই, বাজারে ব্যাগ টানার এই কাজ করেই কোনমতে চলে। জামাল সাহেবের বড় মায়া হয়। একদিন কি ভেবে একেবারে বাসায়ই নিয়ে এলেন তাকে।

লাল আভা কেটে গিয়ে অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনোয়ারার কথা মনে পড়ে জামাল সাহেবের। সারাদিন অফিস শেষে এই বারান্দার মুখোমুখি দু'টি চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে গল্প করার সুখময় সময়গুলো কি সত্যি কখনও ছিলো তার জীবনে? চোখ ভরে আসে জলে। খুব বেমানান আবহ সংগীতের মত বড় ছেলের ঘর থেকে ভেসে আসছে তুমুল হুল্লোড়, বন্ধুদের নিয়ে পার্টি হচ্ছে। মেয়েটা নিশ্চয়ই রোজকার মত এই সময়টায় মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। ছোট ছেলের সামনে পরীক্ষা, নিজের বাসায় তার পড়া হয় না বলে নাকি বন্ধুর বাড়িতে থেকে আজ সারারাত পড়বে। বারান্দার চেয়ারটায় একলা বসে থেকে জামাল সাহেবের বড় শূণ্য লাগে চারপাশটা।

ঠিক এই সময় সামনের গোল টেবিলটায় চা-ভর্তি একটা কাপ আর দু'টো টোস্ট নামিয়ে রেখে তার সামনে মেঝেতে বসে পড়ে বাদশা। এক মুহুর্ত যায়। আরো কিছু মুহুর্ত কাটে নীরব চাহনিতে। কোন কথা হয় না, তবু কি যেন বলা হয়ে যায় তাদের।

----------------------------------------------------------------------------------------------------
এই লেখাটা প্রিয় সচলায়তনের ই-বুক; সচলায়তন অণুগল্প সংকলন "দিয়াশলাই"-এর জন্য লেখা। ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য এখানে তুলে রাখলাম।

Tuesday, March 25, 2008

(রূপ)টুপ(কথা)টথা

হেমিংওয়ের বুড়ো সান্টিয়াগো আর সুকুমার রায় বেশ গলাগলি-দোস্তি মুডে আছে আজকে। একটু বসে আড্ডা দেবে ভাবছে কিন্তু তেমন আরামদায়ক, নিরিবিলি জায়গা পাবে কই? একটু খুঁজে টুজে কি ভেবে তারা বসবার জন্য বেছে নিলো আমার মাথাকেই। চুল নামক বিচ্ছিরি কালো কালো আঁশগুলো সরিয়ে একটু বসতে যাবে ওমনি তাদের গাঁয়ে জেকে বসলো একগাদা খুশকি। এহ! দিলো তো গাঁয়ে এলার্জি বাঁধিয়ে...আ ছি ছি ছি বলে তাদের সেকি লাফালাফি। আমার কি আর এসব সহ্য হয়? দু'হাত দিয়ে নিজের মাথায় নিজেই দিলাম বাড়ি। আর ওমনি এই দুই ভদ্রলোক অভদ্রের মত ঢুকে পড়লো একেবারে খুলির ভেতর মগজে!

এই সেরেছে! একেবারে মগজে ঢুকে গেলো! তা এসেছেন যখন, নমস্কার নমস্কার, সালাম। আপনারা আমার অতি প্রিয় লোক, ছোটবেলায় কত না হযবরল ভাবনায় আপনারা সংগী হয়েছেন। কত না-মেটানো ইচ্ছা সান্টিয়াগোর মত কল্পনায় ভেবে সাধ মিটিয়েছি। একবার ভেবেছিলাম বড় হলে সান্টিয়াগোর সাগরেদ হয়ে এত্তবড় মাছ ধরব সাগরে। তা এতদিন পরে যখন...

"ওরে থাম থাম, অনেক বকেছিস। এবার আমাদের একটু নিজেদের মাঝে গল্প করতে দে। তার আগে বল দিকিনি, ওই যে দেখছিস হাঁস...একটু পরেই ওটা কি হবে?" সুকুমার রায়ের কথায় আমি গর্বিত হেসে বলি, "এ আর এমন কি কঠিন? ও তো হয়ে যাবে সজারু...এই না না, হবে হাঁসজারু। ঠিক হলো?" "বাহ বাহ, বেশ বেশ" সুকুমার বাবু সন্তুষ্ট হলেন। সান্টিয়াগো বললেন, "আচ্ছা, এবার আমাদের একটু গপ্পো করতে দাও মেয়ে। তুমি তোমার কাজ করো"।

হুমম। ঠিক আছে। আমি তবে আমার কাজ করি। কিন্তু এ কি? সব যে কেমন উল্টোপাল্টা লাগছে। আমার মগজ নিয়ে কি তেনারা তবে হাতিপাতি করছেন? ঠিক নয়, ঠিক নয়। মাথাটা ঝিমঝিম ঝিমঝিম রিমঝিম। আহা কি সুন্দর রিমঝিম বৃষ্টি বাইরে...টিপটিপ টিপটিপ পানির ফোঁটা, সাদা সাদা। এই তো রঙ বদলাতে শুরু করেছে, সাদা থেকে হলদে...ওমা বৃষ্টির সাথে আকাশ থেকে কি পড়ছে? এ তো খিচুড়ী! ইশ, খিদে পেয়ে গেলো... ওমনি মা-ও ডেকে উঠলো, সোনামণিমা, আগে ইলিশ ভাজাটা খাবি নাকি গরু ভুনা? আমি চেঁচাই, আম্মু, ইলিশ ইলিশ ইলিশ। মা হাসেন, খুব মিষ্টি করে, খুব খুব খু-উ-ব মিষ্টি। কিন্তু মিষ্টি আমি খাবো না, আমার ভালো লাগে না। আচ্ছা, খুব বললে একটা কেবল চমচম খেতে পারি। মিষ্টি খেতে খেতে আমি সুর করে বলতে থাকি,

"টমটম চমচম গজারির বন/
টাংগাইল শাড়ি তার গরবের ধন।
আহা গরবের ধ-অ-অ-ন।"
ধুর, কি বিচ্ছিরি এক শাড়ি পরেছি আজ, ফিনফিনে। আমার তাঁতের শাড়িটা গেলো কই? কই মাছ? আরেন্নাহ, আর খাবো না মাছ... গাছের ডালে ঝুলতে পারি বরং দোলনাতে...।"দোল দোল দোলুনি/ রাঙা মাথায় চিরুনী/ এনে দেবো হাঁট থেকে..."। ধূর এইসব হাঁট-বাজার আমাকে দিয়ে হবে না। সেখানে কত লোক গিজগিজি, হিজিবিজি হিজিবিজি তিতলী ভাইয়া, কংকা ভাইয়া জানো আজ রবিবার...আজ রবিবার, আজ রবিবার হুমায়ূন আহমেদ। এই হুমায়ূন লোকটা কি যেন একটা গান লিখেছে, "আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে..."

"খামোশ!!!!! এ গান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা।" সুকুমার বাবু বাজখাঁই গলায় ধমকে ওঠেন।
আমি আঁতকে উঠে বলি, "কোন গান?"
-এই যে তুই এইমাত্র যেটা গাইলি।
-আমি গাইলাম? গান? আমি তো গাইতেই জানি না।
এবার সান্টিয়াগো বড় বিরক্ত হলো, "আমারও মনে হয় এটা ট্যাগোর সং"।
সুকুমার ঝাড়ি দেন, "ট্যাগোর নয়, বলো ঠাকুর। তোমাদের সাদা চামড়াদের যতসব মস্করা"।
সুকুমার বাবু এবং মিস্টার সান্টিয়াগো দু'জন দু'দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলেন ৮৭ সেকেন্ড। ৮৭ সান্টিয়াগোর লাকি নাম্বার। তাই সে তক্ষুনি বললো, "এই মেয়ের মাথায় আর নয়, অন্য কোথাও চলো"।
বলেই তাদের গাঁয়ে লেগে থাকা আমার মগজগুলোকে নির্মমভাবে ঝেড়েঝুড়ে দুড়ুম করে বেরিয়ে গেলেন আমার খুলি ফুড়ে।

অনেকক্ষনের মাথাব্যাথাটা হঠাৎ হালকা হলো মনে হচ্ছে। গানটা ভালো লাগছে শুনতে, "আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে...।" আচ্ছা, এই একটা গানই বুঝি আমি সিলেক্ট করে রেখেছি সেই তখন থেকে?

Tuesday, February 26, 2008

আমার দেখা বাংলা সিনেমা (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক)

হলে গিয়ে সিনেমা দেখা বন্ধ হবার পরে টিভিই রইলো একমাত্র সম্বল। একটু বুদ্ধি হবার পর থেকেই যে সিনেমাটি টিভিতে সবচেয়ে বেশি দেখেছি তা"জীবন থেকে নেয়া"। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারী-- যেকোন দেশাত্ববোধক উপলক্ষে এই একটি সিনেমাই দেখানো হতো। সম্ভবত রাজনৈতিক জটিলতায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য যেকোন সিনেমা দেখানোটা ওই সময়ের সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিলো না (হায়!)। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সিনেমাটি যতবারই দেখেছি, নতুন করে ভালো লেগেছে। ছোটবেলায় এই সিনেমার রূপক অর্থটি বুঝিনি, তবুও ভীষন উপভোগ্য মনে হতো। খান আতার সেই চিরদিনের অসম্পূর্ণ গান, " এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে?" কখনোই ভোলার নয়। এবং সেই বিখ্যাত ডায়ালগ, "ঘরে ঘরে দূর্গ গড়তে হবে"...অসাধারণ। একটু বড় হয়ে, একটু বুঝার পর থেকেই কেবল ভাবি, কি পরিমাণ মেধা থাকলে একজন পরিচালক এরকম একটি সিনেমা তৈরি করতে পারেন। কি অসাধারণ প্লট, কি পারফেক্ট রূপক- একটি পরিবারের মধ্য দিয়ে পুরো একটি দেশের সম্পূর্ণ পরিস্থিতিটি তুলে ধরা, সর্বোপরি প্রতিটি পাত্র-পাত্রীর চমৎকার অভিনয়। দেখতে দেখতে মুখস্ত হয়ে যাওয়া এই সিনেমাটি তাই তুমুল উৎসাহ নিয়ে এখনও আবার দেখতে বসি। এই রকম পারফেক্ট সিনেমা বাংলাদেশের চ্চলচিত্র জগতে বোধহয় বিরল। তাই প্রিয় সিনেমা কোনটা কখনো ভাবতে চোখ বন্ধ করে আগে বলে নেই, "জীবন থেকে নেয়া"। হারিয়ে যাওয়া প্রিয় জহির রায়হানের উদ্দেশ্যে আরেকবার হ্যাটস অফ।

ছোটবেলায় মুক্তিযুদ্ধের আর যে সিনেমাটি অনেকবার দেখেছি তা হলো, "আলোর মিছিল", পরিচালনায় মিতা। অভিনেতা অভিনেত্রী মূলত ছিলেন ববিতা-রাজ্জাক, মামা-ভাগ্নি চরিত্রে। আর ছিলেন ফারুক, আনোয়ার হোসেন, রোজী আফসারী। মূলত মুক্তিযুদ্ধের পরের পটভূমি নিয়ে তৈরি এই ছবিতে অসাধারণ একটি গান ছিলো সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া, "এই পৃথিবীর পরে, কত ফুল ফোটে আর ঝরে/ সে কথা কি কোন দিন, কখনও কারো মনে পড়ে"। এই গানে ফুটফুটে ববিতার চমৎকার হাসির কথা মনে পড়ে। আরেকটি গান, "দুঃখ করো না বন্ধু তোমরা যদি না পারি/ আগেকার সেই সুরে সুরে গাইতে আমার গান/ প্রশ্ন করো না হৃদয়জুড়ে এ কোন অভিমান?"

মুক্তিযুদ্ধের আর কোন সিনেমা বিটিভিতে সেই সময় দেখেছিলাম বলে মনে পড়ে না। এরপর টানা অনেকগুলো বছর পরে বিটিভিতে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো '৯৬তে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পরে। তখনই দেখেছিলাম সুভাষ দত্তর "অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (ববিতা)", খান আতার "আবার তোরা মানুষ হ", আলমগীর কবীরের "ধীরে বহে মেঘনা", চাষী নজরুল ইসলামের "ওরা এগারো জন" এই সিনেমাগুলো। '৯৬ আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, একটা একটা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখতাম, আর শিউড়ে উঠতাম- কখনও কষ্ট, কখনও আনন্দে। অসাধারণ সব দেশাত্ববোধ সব গান ছিলো এই সবগুলো ছবিতে, " এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা", "এক নদী রক্ত পেরিয়ে", "মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি", "কত যে ধীরে বহে মেঘনা"। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশের প্রথম সিনেমাটি যতদূর জানি ওপার বাংলার সহায়তায় মির্মিত একটি ছবি, কেন যে নাম মনে করতে পারছি না! ওপারের বিশ্বজিৎ ছিলেন অভিনয়ে। লতা মুঙ্গেরশকরের কণ্ঠে চমৎকার একটি গান ছিলো সেই ছবিতে, " ও দাদাভাই, দাদাভাই মূর্তি বানাও/ নাক-মুখ-চোখ সবই বানাও/ হাত বানাও, পা-ও বানাও/ বুদ্ধ-যীশু সবই বানাও/ মন বানাতে পারো কি? একটা ছোট?/ বোন বানাতে পারো কি?/ দাদাভাই বোন বানাতে পারো কি?"

এরপর অনেক বছর পরে সম্ভবত ১৯৯৫তে হুমায়ূন আহমেদ আবার বানালেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি, "আগুনের পরশমণি"। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঢাকা শহর, ঢাকায় থাকা একটি পরিবারের বন্দি-জীবন, সেই পরিবারে হঠাৎ একজন মুক্তিযোদ্ধার আবির্ভাব- এই নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কাহিনী। আমার কাছে ভীষন হৃদয়ছোঁয়া মনে হয়েছিলো। বিপাশা হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, ডলি জহুর, আবুল হায়াত, শিলা আহমেদ- নাটকের এই মানুষগুলো তাদের অভিনয়ক্ষমতায় আরো মহিমান্বিত করেছিলেন এই সিনেমাটিকে। এই সিনেমাটিও আমি টিভিতেই দেখেছিলাম, হলে নয়। আবার দীর্ঘবিরতির পরে ২০০৭ সালে দেখলাম তৌকির আহমদের "জয়যাত্রা", আন্তর্জাতিক চ্চলচিত্র উৎসবে, জাতীয় জাদুঘরে। এবং একই সময়ে দেখলাম টিভিতে মুক্তি পাওয়া হুমায়ূন আহমেদের "শ্যামল ছায়া"। এই দু'টো সিনেমার পটভূমি আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় একই। তবু ভালো লাগলো দু'টোই।

মূলধারার সিনেমার বাইরে একটি সিনেমার কথা বলতে হবে, তারেক মাসুদের পরিচালনা, ক্যাথরিন মাসুদের প্রযোজনায় "মুক্তির গান"। টিভিতেই দেখেছিলাম। এবং মুক্তিযুদ্ধের সমরকার এরকম একটি প্রামাণ্যদলিল দেখে গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিলো। একটি দৃশ্যের কথা মনে আছে, এখনও লিখতে গিয়ে চোখে পানি আসছে-- ভারতে যাবার আগে তারেক মাসুদ বাংলাদেশ সীমান্তের এক মুঠো নরম কাদা হাতে তুলে নেন। ওই মুহুর্তে হৃদয়ের গভীর থেকে উপলদ্ধি করি "আমার দেশের মাটি/ খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি"। এই সিনেমাতেই প্রথম শুনি মৌসুমি ভৌমিকের কণ্ঠে মর্মস্পর্শী "যশোর রোড" গানটি। তারেক মাসুদের আরেকটি সিনেমা "মাটির ময়না"। এটিও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গল্প নিয়েই, যদিও এতে প্রাধাণ্য পেয়েছিলো মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রের ভুবন। এই চমৎকার সিনেমাটি দেখেছিলাম বলাকা সিনেমা হলে গিয়ে।

এখন অপেক্ষা করে আছি, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে আরো অনেক ভালো ছবি দেখব বলে।
(চলবে)

Sunday, February 24, 2008

আমার দেখা বাংলা সিনেমা

ছোটবেলায় ব্যাপারটা ছিলো ঠিক উল্টো। মানে এখন যেমন নাক প্রায় সিঁটকিয়েই বাংলা সিনেমার বড়জোর খবর নেই, ছোটবেলায় বরং প্রবল আকর্ষন ছিলো সিনেমা ব্যাপারটার প্রতি। আর সিনেমা মানেই বাংলা সিনেমা। বিটিভিতে ইংরেজী সিনেমা দেখাতো বটে কিন্তু সেটাকে সিনেমা না ভেবে "মুভি অব দ্য উইক" ভাবাটাই বেশি যৌক্তিক মনে হত সেই সময়!

অনেক দিন পর্যন্ত আমাদের বাসায় সাদাকালো টিভি ছিলো। তখন টিভিতে দেখানোও হতো বেশিরভাগ সাদাকালো ছবিই। নায়ক-নায়িকা হয় রাজ্জাক-কবরী-ববিতা নয়ত শাবানা-আলমগীর, কখনও শবনম-রহমান। এর বেশি নিজের মনে নেই, তবে আমার মায়ের খুব পছন্দের ছিলো নায়িকা ছিলো সুজাতা। এক্কেবারে পিচ্চীবেলার সিনেমাগুলো বিটিভিতে দেখাতো বৃহস্পতিবার রাত আটটার সংবাদের পরে। আমরা সবাই সার বেঁধে ড্রইং রুমে বসে যেতাম। দেড় ঘন্টা দেখার পরেই ইংরেজী সংবাদ, মানে আধ ঘন্টার বিরতি। সেই সময়েই ঘটতো করুণ ঘটনা। আমার বাবা আমাকে নানান ভাবে ঘুম পাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করত। একেক দিন একেক অজুহাত, "মা, আজকে তো আর দেখাবে না, পরের অংশের ফিতা নষ্ট হয়ে গেছে", অথবা "আরে এইটা শুক্রবারে সকালে আবার দেখাবে তখন দেখো" ইত্যাদি নানা অজুহাত। সেই সব স্বপ্নময় সাদাকালো সিনেমাগুলো আমার কখনই তাই দেড় ঘন্টার বেশি দেখা হয় নি।

তার বেশ কিছুদিন পরে বোধহয় শুক্রবারে সিনেমা দেখানো শুরু হলো। মাসে এক শুক্রবারে বাংলা সিনেমা, বাকি শুক্রবারগুলোতে "মুভি অব দ্য উইক"। ওই এক শুক্রবারের জন্য হা করে বসে থাকতাম। তখন কিছু কিছু রঙীন সিনেমা দেখানো শুরু হলো, কিন্তু আমাদের তো সেই সাদাকালো টিভিই। একটু মন খারাপ হতো, কিন্তু কিছু বলতাম না। কিন্তু যেদিনই আবার সাদাকালো সিনেমা হতো, সেদিনই খুশিমনে বলে উঠতাম, " খুব ভালো হইসে, যাদের বাসায় রঙীন টিভি, আজকে তারাও সাদাকালো দেখবে"!

হলে গিয়েও সিনেমা দেখেছি, প্রথম কোনটা মনে পড়ছে না। তবে অনেক ছোটবেলায় একটা সিনেমা দেখেছিলাম, নাম "ভেজা চোখ"। ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পা , মিঠুন, শিশুশিল্পী জয়া আর মনে হয় দিতি নাকি নিপা মোনালিসা নিশ্চিত নই। চমৎকার সব গান ছিলো। "জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প", "তুই তো কাল চলে যাবি আমাকে ছেড়ে/পরশু কি হবে দেখা এমন করে","প্রিয়া আমার প্রিয়া","পেয়েছি চাচী পেয়েছি ও চাচা" এইগুলো মনে পড়ছে। সিনেমা দেখে কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি নাকের পানি একাকার করে ফেলেছিলাম। পত্রিকার একটা রিপোর্টের শিরোনামও মনে আছে হুবুহু, "ভেজা চোখ দর্শকদের চোখ ভিজিয়েছে"। এখন দেখলে কেমন লাগবে জানি না কিন্তু তখন অসাধারণ লেগেছিলো। চম্পা বোধহয় নতুন এলেন তখন সিনেমায়, আমার কাছে চম্পা-ইলিয়াস কাঞ্চনকে খুবই স্মার্ট লাগতো তখন। :)

প্রায় সমসাময়িক কালে আরো দুইটা সিনেমার কথা মনে পড়ে যেগুলো হলে গিয়ে দেখেছিলাম। মফস্বল শহরের ছোট্ট গন্ডির মজা হচ্ছে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। আর এর মাঝেও যারা কোন কারনে কাছাকাছি থাকে, তাদের আত্মীয়তা বেড়ে যায় আরো অনেক বেশি। আমার বাবা ব্যাংকার। বাবার কলিগদের এবং তাদের পরিবারের মধ্যে খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিলো। এই সব কলিগ-পরিবারের একটা গেট টুগেদারের একটা অংশ ছিলো সিনেমা দেখা। হলের দোতলায় আলাদা একটা রুম ছিলো, কি জানি বলতো ওইটাকে, ডিসিই কিনা? ওই রুমটা রিজার্ভ করে আমরা অনেকগুলো পিচ্চী-পাচ্চী এবং আমাদের বাবা-মায়েরা মিলে দেখতে গেলাম ওই সময়ের মহা-হিট সিনেমা "দুই জীবন"। আফজাল-দিতি, বুলবুল আহমেদ-কবরীর অভিনয়, আবদুল্লাহ-আল-মামুনের পরিচালনা। মজার সিনেমা। আমাদের সব পোলাপানেরই খুব পছন্দ হয়েছিলো। এই সিনেমারও চমৎকার সব গান ছিলো, "তুমি আজ কথা দিয়েছো, বলেছো", "একদিন তোমায় আমি না দেখিলে, তোমার মুখের কথা না শুনিলে","তুমি ছাড়া আমি একা, পৃথিবীটা মেঘে ঢাকা","আবার দু'জনে দেখা হলো, কথা হলো","আব্বু আমার বন্ধু, আম্মু খেলার সাথী, একটি ঘরে জ্বলছে যেন তিনটি সুখের বাতি"...। শেষের এই গানটা মোটামুটি আমার জাতীয়সংগীত হয়ে গিয়েছিলো।

এই সিনেমা দেখার সময় বড়দের আলাপে শুনলাম আফজালের সংগে পাল্লা দিয়ে সুবর্ণা মুস্তফাও একই সময়ে আরেকটি সিনেমা করেছেন, নাম "স্ত্রী"। আম্মু, চাচীরা "স্ত্রী" সিনেমাটি দেখতে খুবই উদগ্রীব হয়ে উঠলেন, অতএব ওইটা দেখতেও সবাই মিলেই যাওয়া হলো। আমার কেমন লেগেছিলো পরিষ্কার মনে নেই তবে বড়দের দেখাদেখি আমিও বলছিলাম, এই সিনেমাটা খুব ভালো হয়েছে! যদিও আমাদের পিচ্চীদের কাছে "দুই জীবন"ই বেশি ভালো লেগেছিলো।

এরপরে বিরাট একটা সময় মনে হয় হলে গিয়ে কোন সিনেমা দেখা হয় নি। বাবার কলিগরা একেকজন নানান জেলায় ট্রান্সফার হয়ে গেলো। সেই চমৎকার গেট টুগেদার গেলো বন্ধ হয়ে। আমরাও হয়ে উঠতে শুরু করলাম একটু একটু করে বড়। এবং সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, শোনা গেলো সিনেমাহলের পরিবেশ এবং দর্শক সবই নাকি খারাপ হতে শুরু করেছে। এই সব নানান কারণে বাংলা সিনেমার প্রতি আকর্ষন সবারই কেন যেন একটু একটু করে কমতে শুরু করলো।

(চলবে)

Saturday, February 02, 2008

বইমেলা...তোমার কাছে যাবো

আমার একটা স্বভাব আছে, কখনও কখনও একটানা একই গান শুনতে থাকি...ঘন্টার পর ঘন্টা। আজ এরকম চলছে, "আমি বৃষ্টি দেখেছি", অঞ্জন দত্তর। শুনতে শুনতে মনটা গানের ভাবের মত হয়ে যায় নাকি আগে থেকেই মনটা তেমন হয়ে আছে বলেই আসলে গানটা শোনা হয়...ঠিক জানা নেই। তবে গান আর মন মিলে অদ্ভুত একটা পরিবেশ তৈরি হয়,
তৈরি হয়ে চলতে থাকে।

আজ দেশের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। বাবার কথা...।

মা'র কথা মনে পড়ে, মা কবি ছিলো না কিন্তু খুব সহজ করে জীবনের দর্শন বলে ফেলতো মাঝে মাঝে। একটা কথা বলতো, "মানুষ কেমন পাখি দেখো, কাল আমি কোথায় ছিলাম আর আজকে কোথায়?" বলে ফিক করে হেসে ফেলতো। এই কথাটা মা তেমন গুরুতর অর্থে যে বলতো না নয়। হয়তো একদিন বেড়াতে গেলাম টাংগাইলে, পরের দিন ঢাকার বাসায় ফিরেছি, তখন। মা'র দৌড় তো ছিলো সেই ঢাকা-টাংগাইল।

বইমেলা শুরু হয়ে গেলো। মা'র সেই কথাটা মনে হচ্ছে বারবার...মানুষ কেমন পাখি, মানুষ কেমন পাখি। আট বছর পর এই প্রথম আমি বইমেলায় যাচ্ছি না। পাখি হয়ে উড়ে উড়ে আমি চলে এসেছি এতটা দূরে যেখানে পৌঁছুতে গিয়ে ডানা গেছে কেটে! এখন আর উড়াল দেবার উপায় নেই। কার্জন বা রোকেয়া হল থেকে হেঁটে অথবা পল্লবী থেকে ভলভো বা ট্যাক্সি ধরে বইমেলায় যাবার কোন উপায় নেই। বইমেলার সামনের সুন্দর রাস্তাটার মাঝখান দিয়ে রাজার মত হেঁটে যাবারও কোন উপায় নেই রে গোলাম হোসেন।

তবুও "মনে তোরে পারলাম না বুঝাইতে রে হায়রে...তুই সে আমার মন..."

Friday, January 25, 2008

নিরন্তর


ছায়ারা কিংবা রূপকথা আসে না আর,
আসে কেবল নিশিকাব্যর মত ভূতুড়ে অবয়ব।
চাঁদের আলো কবেই বিলীন হয়েছে সোডিয়াম লাইটের কাছে ;
এবার হলুদ আলোয় রহস্য খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টায় -
অবশেষে হাসির কাছাকাছি বেঁকে ওঠে ঠোঁট!

তবু শেষ হাসি হাসা হয় না আমার।
এবং তোমার।
অথবা আমাদের।
কিংবা তোমাদের।

Wednesday, January 09, 2008

আজ পড়ব

অনেক দিন কিছু লেখা হয় না। তার চাইতেও খারাপ যে কিছু পড়াও হয় না।

এমনকি নিয়মিত যে ব্লগের পাতায় ঘোরা প্রতিদিনের সকালের নাস্তার মত হয়ে গিয়েছিলো, ইদানিং পড়া হচ্ছে না তা-ও!

অদ্ভুত।

এবং খুব খারাপ।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের "রচনাসমগ্র ১" নামিয়ে রেখেছি সেলফ থেকে পরশুদিন। প্রথম পাতার প্রথম লাইন থেকে "মনোরম মনোটোনাস" মাথায় আটকে দিয়েছেন প্রিয় ব্লগার (অবশ্যই লেখক বলা উচিৎ ছিলো, কিন্তু পরিচয় তো ব্লগেই) মুহম্মদ জুবায়ের। এই শব্দদু'টোই ঘুরছে এখনও চর্কির মত। আজ এগুবো। আজ অবশ্যই আরো অনেকদূর পড়ব।