Friday, November 03, 2006

বাদল দিনের ভাবনা- কবিতায়, গানে


"কিসের এমন প্রেরণা পেয়েছে মন
নষ্ট আঁধারে শ্রেষ্ঠ বাসনা খোঁজে
বুকের অসুখে সুখের স্বপ্ন লিখে
ঘন দুর্যোগ তবু সে ভাসায় বেহুলার সাম্পান..."

...রুদ্র চলে গেছে সেই কবে, কবিতারা রয়ে গেছে...প্রেরণাদায়িনী কবিতারা, আজো ভেসে বেড়ায় বাতাসের গন্ধে...। বাঙালী বড় আজব জাতি, পেটে ভাত নেই তবু খোঁচা দাড়ি মুখে নিয়ে কবিতা ছাড়ে না! এত আবেগ কোথায় পেলো তারা? অন্য কেউ নয় গো, এই আমরাই।
হুম, আমরা। আমি, আপনি--আর কবিতা। আর গান। আর আবেগ এবং বেঁচে থাকার দ্বন্দ অথবা স্বস্তি।

আষাঢ় মাস। ঝরঝর ঝুম বৃষ্টির বাদল দিন। খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজ ছিলো আজ...টানা বৃষ্টিতে ভেস্তে গেলো, বেরুতেই পারলাম না ঘর থেকে। মেজাজ খারাপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে কি ভেবে গান ছেড়ে দিলাম সিডিতে, "আমার হারিয়ে যাওয়া তুমুল কালো মেঘ/ তোর হারিয়ে যাওয়া কাশের বনে..."। অর্ণবের গানের অদ্ভুত সুন্দর সুর আর ভীষন উদাস করা গানের কথায় কোথায় হারিয়ে গেলো কাজের গুরুত্ব !
গানের সুরে, বৃষ্টির শব্দে ভাবতে বসি কি যেন...ভাবতে থাকি...


বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির প্রচন্ডতায় বই পড়া, কাব্য লিখাকে সময় নষ্ট মনে করে জীবনযাত্রা থেকে ঝেড়ে ফেলাটাই বুঝি এখন বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। তবু বাঙালী লিখে যায়, তার আবার বই বেরোয়, এখনও সেই বই মারমার কাটতিতে বাজার কাঁপায়। একুশে বইমেলায় ভীড়ের চাপে হেঁটে চলা দায় হয়ে দাঁড়ায়। এরকম মন্তব্য এখনও প্রচলিত যে বাংলাদেশে কাক ও কবির সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি !


মানুষগুলো বদলে যাচ্ছে দিনে দিনে, বদলে যাচ্ছে যাপিত জীবন...তবু কৈশোর পেরুনো মেয়েটা আজো বদলালো না---পড়াশোনায় মন নেই তেমন, হঠাৎ মোটা কাগজ আর রং-তুলি হাতে বসে পড়ে ছবি আঁকার নেশায়, একলা ঘরে দরজা বন্ধ করে চালিয়ে দেয় সর্বোচ্চ আওয়াজে গান। তার হুট করে আবৃত্তি করে ওঠে, " তোমারও অভিসারে যাবো অগম পারে...কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে..." প্রবল আবেগের তোড়ে অকারণ কি এক কষ্টে তার নবীন চোখ ভেসে যায় জলে।
স্তিতে বেড়ে ওঠা একই বয়েসী মেয়েটা কিন্তু এমন করে গান শুনতে আর পড়তে পারে না... তাই বলে কি তার আঠারো তাকে কিছু দেয় না? না খেয়ে না দেয়ে রাজ্যের ক্ষুধা আর প্রেমহীন ভালোবাসাহীন পরিবেশে সেও যে আনমনে গেয়ে ওঠে, "তুই যদি আমার হইতি রে, ও বন্ধু আমি হইতাম তোর, কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর রে..." কার জন্যে ভালোবাসায় শুষ্ক মনে প্রেম জাগে সে কি নিজেও তা জানে?


জানা যায় না অনেক কিছুই। দেখাও যে যায় না কত কি! শুধু অনুভব করা যায়। যে রিকশাওয়ালা এই সভ্য (!) যুগে তার পাশের জনকে চৌদ্দ পুরুষের নাম উদ্ধার করে গালি দেয়, অহেতুক ঝগড়া বাঁধিয়ে রাস্তায় যানজট সৃষ্টি করে ফেলে তার মনের ভেতরের অনুভূতির ঝড়ের খোঁজ কি আমরা রাখি? তারও ভেতরে যে এক সভাবকবি থাকে, সারা দিন শেষে কান্ত রাতে যে গেয়ে ওঠে, " আমি যে রিশকাওলা, দিন কি এমন যাবে? বলি তাই হে মাধবী তুমি কি আমার হবে? আমি যে রিশকাকবি" ।


কবিতা আর গান উজ্জীবিত করেছে বাঙালী জাতিকে বরাবরই। কখনও শান্তিময় জীবনে রোমান্টিক অনূভুতি জাগিয়ে, আবার কখনও ঝিমিয়ে পড়া মানসিকতাকে টেনে তুলে। তাই যুগে যুগে যখনই প্রবল বাস্তবতা আর আর শোষণ চেপে ধরেছে বাঙালী জাতিকে--সেই তেভাগা থেকে একাত্তরের মুক্তি সংগ্রাম অথবা আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের কানসাট---তখনই তার প্রেমময় মনে অস্থিরতা আর বিদ্রোহ জন্ম নিয়েছে। যুগে যুগে তাই বাঙালী বিপ্লব করেছে, বিদ্রোহ করেছে, অস্ত্র তুলে নিয়েছে হাতে আর সাথে সাথেই কলম যুদ্ধে সৃষ্টি হয়েছে অমর কবিতামালা। "এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়"। হাল ছেড়ে দেয়া চরম দুর্দিনে সেই সব কবিতা গান আমাদের উৎসাহ জুগিয়েছে, নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।


কবিতা আর গান-- এমনি করেই ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশের মানুষের সমস্ত স্বত্তা জুড়ে। তাদের কেউ জীবনকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় উদাসীনতায় আবার কেউবা আজীবন টানতে থাকে সংসারের ঘানি। আর কোন এক উদাসী মুহুর্তে বা অথবা প্রচন্ড কান্তি শেষের অবসরে আঁকড়ে ধরে কোন গান ... অথবা... কবিতা।
বাংলালাইভ অনলাইন পত্রিকা থেকে নেয়া।