Saturday, November 24, 2007

"তারা আমাদের ভাই, মানব ভাই..."


দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ-সামগ্রী যে তাদের কাছে না গিয়ে অনেক সময়ই কোথায় যায় তা বোধহয় আমরা এখন ভালোই জানি। দুদকের অভিযানে দরিদ্র মানুষের অধিকারের ত্রাণের টিন, কাপড়, এমনকি বিস্কুট (!) পরিহাস করতে করতে মুক্তি পেয়েছে পেটমোটা বোয়ালগুলোর বাড়ি থেকে। কাজেই, যতই মরুক মানুষ ঘূর্ণিঝড়ে, যতই তাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যাক, যতই তাদের সদ্য পাকা ফসল মিশে যাক মাটির সাথে ইউপি চেয়ারম্যানের তাতে কি? ত্রাণের জন্য ৩৮৫ কেজি চাল পাওয়া গেছে, এতে আর ক'দিন, ক'জনের চলবে? তার'চে যার আছে তার আরেকটু বাড়ুক...এই যুক্তিতেই বুঝি আটকে দিয়েছিলো ত্রানের চাল। অতিকায় পিরানহা দেখে উদ্বুদ্ধ হওয়া এই বোয়াল অবশ্য পার পেলো না, কেমনে কেমনে জানি ধরা পড়ে গেলো। তার সাধের হঠাৎ পাওয়া চালগুলো চলে গেলো আধমরা মূল্যহীন মানুষগুলোর কাছে।

এসব খবর এখন আমাদের পুরোপুরি চোখ সওয়া, মন সওয়া। বিকার হয় না তেমন কোন পড়ে। অন্য খবরে চলে যাই তাই, আগে পাতা উল্টাতাম, এখন মাউজ ক্লিক করি, এই কেবল পার্থক্য। চোখের সামনে একের পর এক দুঃসংবাদ...তারপর হঠাৎ কোন খবরে আমাদের সব সয়ে যাওয়া চোখ হঠাৎ ভিজে উঠে। হায়, ইউপি চেয়ারম্যান নিজের থাকতে কেড়ে নিয়েছিলো, আর এই নিঃসহায় মানুষগুলো...!

না তেমন কিছু নয় ওরা, ওরাও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এক জনপদ- বাগেরহাটের জয়মনির ঘোল গ্রাম। ঘূর্ণিঝড়ে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙেছে অনেকের, গাছ ভেঙ্গেছে, ফসল নষ্ট হয়েছে। তবু ঠিক পাশেই শরণখোলার ভয়াবহ রূপের কাছে ওদের ক্ষতি কিছু নয় জেনে নিজেদের সামাণ্যতম সম্বলগুলো ভালোবেসে তারা দিয়ে এসেছে প্রতিবেশী গ্রামকে। জয়মনি অঞ্চলে খাবার পানির বড় অভাব, বৃষ্টির পানি সঞ্চয় করে তাই সারাবছর ধরে ব্যবহার করতে হয় তাদের। সেই মহামূল্য সম্পদ থেকে তিন হাজার বোতল এবং পঞ্চাশটি বড় ড্রাম ভরে প্রায় ৫০০০ লিটার পানি দিয়েছে তারা শরণখোলার সাউথখালী গ্রামের মানুষকে। নিজেরা অতিসামান্য সম্বল থেকে কাপড়, শীতের কাপড়, খাবার, ওষুধ, স্যালাইন যা পেরেছে তাই দিয়ে দাঁড়িয়েছে তারা অপেক্ষাকৃত বেশি অসহায় মানুষগুলোর পাশে। এখানেও ইউপি চেয়ারম্যান আছে, তার ডাকেই সব মানুষ এক হয়েছে মানবতার খাতিরে। কত অবলীলায় সুন্দর আলী খাঁ বলতে পারে, "তারা আমাদির ভাই, মানব ভাই। আমার এক ভাই কষ্ট করতিছে, তাই দিছি"।

কিছুই নেই তাদের, আছে কেবল মানবতাবাদী মন। আছে যে সে খবর হয়তো জানেও না তারা। কখনও চর্চা করে নি, কখনও এক লাইন দাম্ভিক কথা লিখেনি, কখনও বক্তৃতা দেয় নি নিজের মহানুভবতা অবগত হয়ে। অথচ ঠিক সময়ে ভেতর থেকে উপচে উঠেছে তাদের অমূল্য সম্পদ, 'মন'। মানুষ হবার এই মৌলিক অথচ বর্তমানে মহামূল্য সম্পদটি যদি এমনি করেই সমস্ত মানবজাতির থাকতো!


------------------------------------------------------------
তথ্যসূত্রঃ "প্রথম আলো"তে করা কুররাতুল-আইন-তাহমিনা'র রিপোর্ট।

Tuesday, November 20, 2007

"মাঝরাতে ডুবেছে মাতাল..."

শিবু,
কি করিস? শুয়ে শুয়ে সঞ্জীবের গান শুনছি...
ঘুম আসে না...
কেমন যেন নির্লিপ্ত কষ্ট ঘিরে থাকে...
শূণ্য...ঝাপসা অনুভূতি...
এক মুহুর্তে সব কেমন করে শেষ হয়ে যায় দেখেছিস ?
বলেছিলাম না--মানুষের জীবন আর ক'টা দিন বেঁচে থাকা কি আশ্চর্য অর্থহীন !

Monday, November 19, 2007

"কার ছবি নেই। কেউ কি ছিলো?"


গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছে কষ্ট...
সঞ্জীব চৌধুরী, আমাদের সঞ্জীব চৌধুরী...
কিছু লিখতেও পারছি না...
কোমা থেকে মিরাকলের মত জেগে উঠে আবার গেয়ে উঠবেন, "আমি ফিরে পেতে চাই সেই বৃষ্টিভেজা সুর/ আমি ফিরে পেতে চাই সাত সুখের সমুদ্দুর"...এই সব আশা আমাদের মিথ্যে হলো...


আর কিছুই বলার রইলো না।

Sunday, November 18, 2007

ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং তারপর আমাদের দেশ

দেশটা কেন যেন স্বস্তি পায় না কখনই। যুদ্ধ করে অনেক ত্যাগে স্বাধীন হলো, এখন সেই স্বাধীনতা রক্ষা নিয়ে করতে হচ্ছে নতুন যুদ্ধ। দুর্নীতি যখন দেশের দরিদ্র মানুষদের আরো দরিদ্র করে দিচ্ছে, তখন তাদের পুরোপুরি নিঃসহায় করে দিতে উপাদান যোগাচ্ছে প্রকৃতি- বারবার। কখনও ভূমিধ্বস, কখনও প্রবল বন্যা, এবার প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়- সিডর!

১৯৯১ সালের ১৯শে এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছাসের ভয়াবহ স্মৃতি আমরা কখনও ভুলব না। এবারের ঘূর্ণিঝড়কে তুলনা করা হচ্ছে তার সাথে। বরং কেবল উপকূলীয় নয় এবার আক্রান্ত হয়েছে দেশের আরো অনেক অঞ্চল। খুলনা বিভাগের বরিশাল, ঝালকাঠি, সাতক্ষীরা, বরগুনা, বাগেরহাট, মাদারীপুর, পিরোজপুর, দুবলার চর সব জায়গায় প্রায় সহস্রাধিক মানুষ মারা গেছে। পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে মাটির সাথে মিশে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। পাকা ধান ঝড়ের তান্ডবে মিশে গেছে ক্ষেতের সাথে। দেশের বিদ্যুৎ অবস্থা, টেলিযোগাযোগ পুরোপুরি বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। এই লেখাটি লিখেছিলাম, ঘূর্ণিঝড়ের খবর পাবার পরপর গতকাল। আজ খবর এসেছে আরো আরো আরো মৃত্যু আর লাশের...

হাজার হাজার মৃত্যু... যারা বেঁচে আছে তারা এখন কি নিয়ে বাঁচবে সর্বস্ব হারিয়ে? এখন পর্যন্ত জানা খবরে ৩ লাখ ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো ৫ লাখ ।

প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে করেই তবু বেঁচে থাকতে হয়েছে এদেশের মানুষকে বারবার। আবার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে সহায় হতে হবে দেশের সমস্ত মানুষকে। জানি না কেমন করে কাটানো যেতে পারে এই ভয়াবহ বিপদ। যারা মারা গেছে তাদেরকে আমরা বাঁচাতে পারিনি, কিন্তু যারা এখনও কোন মতে বেঁচে আছে তাদের জন্য কি আমরা কিছু করতে পারি না? নিজেদের যার যা সামর্থ আছে সেইটুকু দিয়েই কি আমরা দেশের মানুষের এই বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি না?

যারা দেশে আছেন, জানি তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ সেই ভরসা রাখি। আর যার প্রবাসী, তাদের উপায় নেই সশরীরে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। তাই প্রিয় সচলায়তন ব্লগের ব্লগার ইশতিয়াক রউফ-এর দেয়া পেপাল লিংকটি এখানে দিচ্ছি। প্রবাসী যারা পড়ছেন এই লেখাটি, তাদের সবাইকে অনুরোধ করছি এই লিংকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে।

http://www.bang.org.vt.edu/makhan.html

অথবা রেডক্রিসেন্টে সাহায্য পাঠানোর ঠিকানাটিও দিয়ে রাখছি এখানে।

Bangladesh Red Crescent Society
A/C No. 01-1336274-01
Standard Chartered Bank
Dhaka Bangladesh
SWIFT Code: SCBLBDDX

বন্যা, প্রবল বৃষ্টি, তারপর ঘূর্ণিঝড়...পাকা ফসল নিঃশেষ হয়ে গেলো। বাংলাদেশের কৃষক কাটিয়ে উঠুক এই মহাবিপদের দিন। সেই প্রার্থণা রইলো।

Saturday, November 10, 2007

যাও পাখি


যোগাযোগের গতিময়তা ধীরে ধীরে
কমে আসা শুরু করেছে।
আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা বাঁধনের সুতো
দূরত্বের টানে ঢিলে হয়ে এসেছে যদিও
একেবারে ছিঁড়ে যায় নি ,
অদৃশ্য কোন জেদী সূতোর
পাকানো গিঁটের কারনেই হয়তোবা...।

একদিন সেই জেদী সূতো এঁকে বেঁকে
পেঁচিয়ে কেমন ডানা হয়ে যায় -
ছোট দু'টি পা...দু'টি ঠোঁট...
ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা ভালোবাসা...
সে ফিসফিস করে আমায় বলে,
"বন্ধু, ভালো আছিস তো ?"

আমি বুকের ভেতর হেঁচকা টানের
ব্যথায় কুঁকড়ে উঠি সুখে।
আমার ঢিলেঢালা বাঁধন ফের পোক্ত হয়ে ওঠে।

Saturday, November 03, 2007

বিন্দুর ছেলে


একটা সিনেমা দেখলাম একটু আগে। "বিন্দুর ছেলে"। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে মুশফিকুর রহমান গুলজারের পরিচালনা। অভিনয়ে- মৌসুমী, দিতি, হুমায়ূন ফরিদী, ফেরদৌস প্রমুখ। সিনেমা কেমন লাগলো, কার অভিনয় কেমন হলো, এসব গভীরতর চিত্র সমালোচনার উদ্দেশ্যে অবশ্য এই লেখা শুরু করি নি। উদ্দেশ্য বরং একেবারেই ভিন্ন। এই মুভি দেখে আমার ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেলো যে, তাই ।

আমার স্কুল- বিন্দুবাসিনী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
আমরা তিন বোন। তিনজনই এই স্কুলেই পড়েছি। সবার বড় বোন যখন ক্লাস নাইন কি টেন, আমি তখন মাত্র ওয়ানে ভর্তি হলাম। তারও আগে মাঝে মাঝে আপুর সাথে এমনি এমনি যেতাম স্কুলে। বড় আপুর বান্ধবীরা সবাই ভীষন আদর করতো। সেই আদরের টানেই আমার আপুর সাথে যাওয়া।

বড় আপুর সময় স্কুলে মর্ণিং-ডে শিফট আলাদা ছিলো না। আপুদের ক্লাস শুরু হতো খুব সম্ভবত সকাল এগারোটার দিকে। আর শেষ হতো পাঁচটায়। টিফিন পিরিয়ডে ওরা খুবই মজা করতো। কয়েকটা আপুর কথা বেশি মনে পড়ে, বড় শম্পা আপু, ছোট শম্পা আপু, খনা আপু, লাবণ্য আপু, মণি আপু... এরকম আরো অনেকেই। ওরা টিফিন পিরিয়ডে নানা রকম শয়তানী করতো। টীচারদের নকল করা তো সব পোলাপানেরই কমন অভ্যাস, সেসব। তারপর বিভিন্ন কমেডি নাটক বানিয়ে অভিনয় করা, কৌতুক বলা...আবছাভাবে এইসবই মনে পড়ে। ক্লাস টেনকে আমার তখন খুব বিশেষ একটা কিছু মনে হতো। মনে হতো, ওরা কত বড়, কত স্মার্ট! আমি কবে ক্লাস টেনে উঠবো?!

আমার বড় আপুনির নাম শারমীন জাহান শাম্মী/শিমুল। এই স্ল্যাশ-এর রহস্য হচ্ছে, আম্মু ডাকতো শাম্মী আর বাবা ডাকতো শিমুল। পরে শাম্মীটাই চালু হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু বড় আপুর বেশি পছন্দ ছিলো শিমুল নামটাই। এটা হারিয়ে না যায় এজন্যে ও কোথাও নাম লিখলে এভাবে দুইটাই লিখতো। তো আমার এই আপুনীর গ্রুপের দুষ্টু এবং দুষ্টু মাত্রই অবধারিতভাবেই ট্যালেন্টেড মেয়েরা মিলে স্কুলের প্রোগ্রামে নাটক করবে ঠিক করলো। ওই সময় ওদের পড়ার তালিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর শরৎচন্দ্রই বেশি স্থান নিয়েছিলো বোধ করি। যদিও বড় আপু ব্যক্তিগতভাবে সত্যজিৎ রায় এবং তাঁর ফেলুদা'র বিশেষ ভক্ত ছিলো। আর ওর পড়ার টেবিলে "ড্রাকুলা" নামের একটা বই থাকার ভয়ে ওই টেবিলের আশেপাশ দিয়েই যেতাম না মনে আছে। পড়তো "মাসুদ রানা"ও। কিন্তু নাটক বানানোর জন্য এগুলোর চাইতে চিরকালীন জনপ্রিয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেই ওরা বেছে নিয়েছিলো।

শরৎবাবুর "বিন্দুর ছেলে"ই কেন ওরা মঞ্চস্থ করবে বলে ঠিক করেছিলো তার কারন আমাকে না বললেও আন্দাজ করতে পারি। আমাদের স্কুলের নাম বিন্দুবাসিনী। আর এই গলের মূল চরিত্রের নামও বিন্দুবাসিনী। এই হয়তো কারণ। দু'টো প্রধান চরিত্র হচ্ছে "বিন্দু" এবং তার ভাসুরের বৌ। এই দু'টো চরিত্রের জন্য স্কুলের সবচেয়ে সেরা দুই সুন্দরী আপুকে নির্বাচিত করা হলো। এর মধ্যে বিন্দু হলো বড় শম্পা আপু এবং বড় বৌ হলো লুবনা আপু। এই দু'জনের মধ্যে বড় শম্পা আপু শুধু আমাদের স্কুলেই নয় বরং পুরো টাংগাইলের ছেলেদেরই হৃদয় কাঁপানো সুন্দরী ছিলেন, এটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। তখনকার সময়ে কাউকে বেশি সুন্দরী বুঝাতে হলে আমরা উদাহরণ দিতাম যে শ্রীদেবী'র মত সুন্দর! কিন্তু শম্পা আপু দেখতে আক্ষরিক অর্থেই শ্রীদেবীর মত ছিলেন। লুবনা আপুও অনেক সুন্দর ছিলেন।

তো এই দুই সুন্দরীকে দুই মূল ভূমিকায় রেখে তৈরি করা নাটকটা কেমন হয়েছিলো, কে কেমন করেছিলো বিশদ বলতে পারলে ভালো হতো নিশ্চয়ই কিন্তু দূর্ভাগ্য, স্মৃতি আর টানতে পারছে না। কিন্তু ভালো লাগার অনুভূতিটা স্পষ্ট মনে গেঁথে আছে। ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে দুই মা'য়ের দ্বন্দ দেখে সেই ছোট্ট আমার চোখে জল এসেছিলো তাও মনে পড়ে। তাই এতগুলো বছর পরে (কমপক্ষে ১৮/১৯ বছর) "বিন্দুর ছেলে" নিয়ে সিনেমা হয়েছে জেনে উৎসাহ নিয়ে দেখতে বসে গেলাম। সিনেমা ভালো-মন্দ যাই হোক (মন্দ নয়), আমার সেই ভীষন শৈশবকালকে একটুক্ষনের জন্য হলেও ফিরিয়ে নিয়ে এলো তো। এই বা কম কি?