Friday, November 14, 2008

"আগুনপাখি" পড়েছি বলে

এইমাত্র একটা উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম। উপন্যাস নয়, যেন পূর্ণ একটা জীবন-দেশ-ইতিহাসের দলিল। হাসান আজিজুল হক-এর "আগুনপাখি"। বইয়ের পাতা বন্ধ করে দেখি চোখে কেমন পানি আসতে গিয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে, বুকের ভেতরটা গুমড়ে উঠতে গিয়ে শক্ত হয়ে উঠছে, ঠিক তারই মত। সে-- নাম কি তার? পুরো উপন্যাসে কোথাও কি তার নাম এসেছে একবারও? মনে পড়ছে না তো। কিন্তু সেই এই উপন্যাসে প্রধান চরিত্র, তার বয়ানেই সবটা বলা।

সেই বয়ান বড় সরল। ঠিক ঠান্ডা জলের মত শান্তিময়। কত কি ঘটে গেলো তার জীবনে।

আমি গ্রামে জন্মাইনি। মাঝে সাঝে হঠাৎ বেড়াতে যাওয়া ছাড়া গ্রামের কিছুই জানি না। "আগুনপাখি" পড়েছি বলেই এই গ্রাম্য সরল মহিলার বয়ানে গ্রামীন জীবন এবং তা দেশ-কাল অতিক্রম করে জীবন্ত হয়ে আজ আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন আমিই মাতৃহারা কৈশোরে ভাই কোলে নিয়ে পার করে দিতাম বেলা। তেমনি দিন পার করতে করতেই একদিন পা দিয়েছিলাম নতুন সংসারে। রূপকথায় শোনা "ফসলভরা ক্ষেত, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ" নিয়ে সমৃদ্ধ ছিলো সেই সংসার। মস্ত বড় বাড়ি, তেমনই বড় সংসার, স্বামী-সন্তান-শাশুড়ী-ননদ-দেওর-ভাসুর-জা আর রাখাল-মানিষ-মুহুরী নিয়ে ভরা। কোথাও কোন কমতি নেই। কত্তা বড় শক্ত-শীতল মানুষ, একা সামলে চলেন গোটা সংসার। তার কথার উপরে কেউ কোন কথা বলে না। সেই তুমুল সুখের জীবনেই হঠাৎ কোন দুনিয়ার যুদ্ধের ছায়াও লাগে। হঠাৎ পরনের কাপড়ে বড্ড কমতি পড়ে যায়। সেই সাথে স্বদেশী আন্দোলনে একাত্ব হয়ে মোটা কাপড় পরা শুরু হয়, একদিন সেই কাপড়ও আর যেন জোটে না। সূতা-রং আর অন্যান্য কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় দেশী তাঁত। এর মাঝে "ওলাবিবি" আর "মা-শেতলা"ও ছাড়ে না...গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে তারা কলেরা আর বসন্তে নিঃশেষ করে দিয়ে যায় গ্রামকে গ্রাম। প্রকৃতিই বা ছাড়বে কেন? পরপর দু'বছর ফসল হয় না--একবার খরায়, একবার অতি বর্ষনে। হায় আকাল। তবু এই করেই দিন যায়। দুঃখ-কষ্টে ভেঙে ছত্রখান হয়ে যায় সেই বিশাল সংসার, সবাই আলাদা, যার যার মত। আকাল কাটে, আসে নতুন দুর্দিন। দেশে স্বাধীনতার আন্দোলনের মাঝে কে যেন রব তোলে মোসলমানের আলাদা দেশের দাবি তুলে। শুরু এক সম্পূর্ণ নতুন যুদ্ধ, হিন্দু-মোসলমানের যুদ্ধ। দিকে দিকে হিন্দু আর মোসলমান একে অপরকে মেরে কেটে এতদিনের সহাবস্থান সব ভুলে যায়, ভারতবর্ষ স্বাধীন করে দেবার আগে ব্রিটিশদের শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়। আসে স্বাধীনতা, আর ভেঙে টুকরো টুকরো হয় ভারতবর্ষ।

এই আমার শেকড়, আমার ইতিহাস।

এই মহিলা, যিনি আজীবন মুখ বুজে কেবল পিতা বা স্বামী বা শাশুড়ীর আদেশই পালন করে গেলেন। নিজের কোন অভিমত কোন বিষয়ে দিতে গেলেন না এবং তা হাসিমুখেই, সেই একই মানুষ তার সমস্ত জীবনের সবটুকু অভিজ্ঞতা নিয়েই সবার বিপরীতে, সবার অমতে আঁকড়ে রইলেন তার দেশের মাটি।

দেশভাগের পরে সবাই যখন আলাদা হয়ে যাওয়া মোসলমান দেশ পাকিস্তানে যেতে শুরু করলো, তখন নিজের দেশে বসে থেকে তিনি ভাবেন--

"আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না ক্যানে আলাদা একটো দ্যাশ হয়েছে গোঁজামিল দিয়ে যিখানে শুদু মোসলমানরা থাকবে কিন্তুক হিঁদু কেরেস্তানও আবার থাকতে পারবে। তাইলে আলাদা কিসের? আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না যি সেই দ্যাশটো আমি মোসলমান বলেই আমার দ্যাশ আর এই দ্যাশটি আমার লয়। আমাকে আরো বোঝাইতে পারলে না যি ছেলেমেয়ে আর জায়গায় গেয়েছে বলে আমাকেও সিখানে যেতে হবে।"

হায়, হিন্দুরাষ্ট্র আর মুসলমানরাষ্ট্র তত্ত্বর অসাড়তা, অবাস্তবতা এবং অকার্যকরিতা ভারতবর্ষর হাজারো সাধারণ মানুষ মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করলেও, করে নি দেশের হর্তা কর্তারা।

ইতিহাস, কিন্তু তথ্য-তত্ত্বর খটখটে বিবরণ নয়, অতি সাধারণ গ্রাম্য এক মহিলার জীবনের ছবি এঁকে, তারই মুখে সেই জীবনের কাহিনী বর্ণনা করে যেভাবে এখন থেকে অনেক কাল আগের সেই সময়ে লেখক নিয়ে যেতে পেরেছেন পাঠককে, এর চেয়ে সহজে আর কি করে ততটা বাস্তব উপলদ্ধির জন্ম দেয়া যেত আমার জানা নেই। "আগুনপাখি" হাসান আজিজুল হক-এর প্রথম এবং এ পর্যন্ত একমাত্র উপন্যাস। ১৯৬০ সাল থেকে লেখালেখি করে এতটা স্বনামধন্য হবার পরেও কেন এতদিন কোন উপন্যাস লিখেন নি, এই প্রশ্নের মুখে "আগুনপাখি" একটি যথার্থ উত্তর। এরকম একটি উপন্যাস সারা জীবনে একটি লিখতে পারলে বোধহয় লেখক জীবনে আরও খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন পড়ে না।

Thursday, November 06, 2008

এই স্বপ্ন ভেঙে না যায়...

রোজ সকালে এলার্ম দেয়া থাকে, সুন্দর একটা সময়, যেন সব কিছু ঠিকঠাক করে নেয়া যায়। আমার ওঠা হয় না। ন'টার এলার্ম পেরিয়ে দশটা, এগারোটা...। কোনমতে ঘুম ভেঙে ধুমধাম। সেই ঠিকঠাক করে আর কিছুই করা হয়ে ওঠে না। আজও তাই হলো। কিন্তু আজ সকালের ঘুমে স্বপ্ন দেখেছি...দারুণ! দেখি আমি দেশে গিয়েছি। বাবা, ছোট'পু, বড়'পুর সাথে দেখা হলো, ওদের জড়িয়ে ধরে কত গল্প। ধোঁয়া ধোঁয়া স্বপ্ন নয়, একদম যেন টলটলে জলের মত...পরিষ্কার অনুভূতি। তারপর দেখি, সবাই মিলে ঘুরতে গিয়েছি...সাগর পাড়ে।

তারপর কেমন যেন স্বপ্নের মাঝেই বুঝতে পারি, এইসব ভালোলাগা সত্যি নয়। আত্মাটা বুঝি উড়ে চলে গিয়েছিলো সাত সাগর পাড়ি দিয়ে আমার আপন দেশে, আর একটু একটু করে যখন সে ফিরে এসে আমার দেহে আবার বসতে থাকে, ঠিক তখনই বুঝতে পারি আমি স্বপ্ন দেখছি। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে যতই আমি বাস্তব থেকে স্বপ্নে ফিরে যেতে চাই, বাস্তবতা ততই আরো আষ্টেপৃষ্ঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার অস্তিত্ব থেকে সবাইকে দূরে সরিয়ে নেয়...

ভেঙে যায় আমার স্বপ্ন।

বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে...ভীষন! এখনও বাড়িতেই আছি, নিজের ঘর, নিজের সংসার। অনেক ভালোলাগা, অনেক ভালোবাসা প্রতি মুহুর্তে ঘিরে থাকে। তবুও...কেমন যেন ইচ্ছে করে একটুখানি বাবার কোলে বসতে, আপুদের সাথে আল্লাদি করতে। একটুখানি আমার নিজের দেশের দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে...

কবে যাবো?