Sunday, October 21, 2007

ঢাম ঢাম পূজোর স্মৃতি



আমার কিচেনের সিংকের কলটা ঠিকমত বন্ধ হয় না কিছুতেই। পানি পড়তেই থাকে একটানা। খুব জোরে চেপে বন্ধ করার আগে পর্যন্ত নিজস্ব একটা ছন্দে পানি পড়তে থাকে। হঠাৎই এক সময় খেয়াল হলো যে এই শব্দটা ঠিক টিপটিপ নয়। কেমন যেন বরং "ঢাম ঢাম"। একটু খেয়াল করে শুনতেই দেখি কেমন যেন উৎসব উৎসব লাগছে। বুঝলাম কেন শুনছি এতক্ষন ধরে। শব্দটা আসলে ঠিক পূজোর ঢাকের মত!

ক্রমাগত পানি পড়ার শব্দের বিরক্তি কেটে গেছে আমার সেদিন থেকেই। এখন যত শুনি কেবল দেশের কথা মনে হয়, মনে হয় পূজোর কথা। ছেলেবেলায় পূজোর উৎসব আর প্রতিমার দেখার তীব্র আগ্রহ থেকে শুরু করে এই মাত্র ক'দিন আগের ইউনিভার্সিটির উৎসবমুখর ক্যাম্পাস, সব কিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

ছেলেবেলায় কি ভীষন আকর্ষন ছিলো প্রতিমা দেখার! অত ছোট বয়সে ধর্ম কিছু বুঝতাম না। যেখানে সবাই আনন্দ করতো সেখানেই ছিলো যত আকর্ষন। কাজেই পূজো শুরু হলো তো প্রতিমা দেখতে যেতেই হবে। বিকালবেলা সুন্দর কোন ফ্রক পড়ে আমি রেডি। আম্মু হাসতে হাসতে চুলে পরিপাটি দুইটা বেনী করে চোখে টানা কাজল দিয়ে দিতো। আমি আমার ছোট আপুর (মেজো বোন) হাত ধরে বেরুতাম প্রতিমা দেখতে। আমাদের ভীষন প্রিয় সেই ছোট্ট মফস্বল শহর টাংগাইল। ছোট কিন্তু খুব ছিমছাম একটা শহর আমাদের টাংগাইল। আমরা তখন থাকতাম আকুর টাকুর পাড়ায়। আমাদের বাসার আশেপাশ দিয়ে কত গলি-ঘুপচি। অনেক হিন্দু-বাড়ি ছিলো ওখানটায়। যেখানেই ঢোলের শব্দ, সেখানেই ঢুকে গিয়ে দেখতেই হবে আমাদের। প্রতিটা বাড়িতে ছোট পরিসরে নিজেদের প্রতিমা-পূজো হতো। একটা বাড়ি - ওদের একটা আলাদা ঘর ছিলো, আর সেই ঘরের পুরোটা জুড়ে আলাদা আলাদা তাকে অনেক অনেক খুব ছোট ছোট প্রতিমা সাজানো থাকতো। আরও অনেক নকশা করা ছিলো দেয়াল জুড়ে। প্রতি বছর এই বাড়িটাই থাকতো আমার প্রধান টার্গেট। তখন বুঝি নি, এখন স্মৃতি থেকে মনে হয় যে সম্ভবত ওগুলো টেরাকোটার মত ছিলো। একবার ভীড়ের কারনে আমার চার বছরের ছোট্ট শরীর ওই বাড়িতে ঢুকতে পারলো না, এত মন খারাপ হলো।

নিজেদের পাড়ার সব ছোট ছোট পূজা-মন্ডপ দেখা শেষ হলে আমরা বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করতাম সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে ফেরার। তখন বাসার সবাই মিলে যাবো বড় কালীবাড়ির সবচেয়ে বড় পূজা-মন্ডপ দেখতে। এক রিকশায় আম্মু, আর বাবার কোলে আমি, আরেক রিকশায় ছোট আপু-বড় আপু। পাঁচজন মিলে ভীড় ঠেলে প্রতিমা দেখে মেলা ঘুরে টুরে বাড়ি ফিরতাম আরো রাতে।

আরেকটু বড় হতে হতে মা-ও বড় হয়ে গেলো, তখন আর আমাদের সাথে মা যেতো না। মফস্বল শহরে আপুরাও বড় না হতেই বড় হয়ে গেলো অনেকখানি, কেবল আমি বাসায় সবার ছোট বলে আজীবন ছোটই রয়ে গেলাম। তাই প্রতি বছর পূজোয় আমার মেলায় যেতেই হবে, যেতেই হবে প্রতিমা দেখতে। বাবার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান, জেদ করে করে অবশেষে চলে যেতাম দুজন মিলে। আরো কিছু বড় হলে পরে মেলায় ঘুরতাম বন্ধুরা মিলে, মাসীমাদের আদরের হাতের মোয়া-মিষ্টি খাওয়ার আশায় জুড়ে বসতাম তাদের খাটের ওপর সারাদিন ধরে।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় পূজার সার্বজনীন উৎসবের স্বরূপটা দেখলাম সবচেয়ে ভালো করে। আমি থাকতাম রোকেয়া হলে, ঠিক পাশেই জগন্নাথ হল। কি মহা ধুমধাম করে যে পূজা পালন হতো সেখানে। প্রায় সমস্ত ডিপার্টমেন্ট পূজা-মন্ডপ সাজাতো জগন্নাথ হলে (ইসলামিয়াত এবং আরবী ছাড়া :) )। সব ধর্ম নির্বিশেষে উৎসব কেমন করে পালন করতে হয় তার একটা দারুন উদাহরণ আমি দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুজার অনুষ্ঠানগুলোতে। স্বরসতি পূজার দিনে আমি খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে যেতাম নিজেদের হলের পূজা-পালন দেখার জন্য। সবার ছবি তুলে দিতাম আমি। কেমন করে জজ্ঞ করা হয় দেখলাম তখনই প্রথম। আর বিকালবেলা শাড়ি পড়ে, বড় লাল টিপ আর কখনও কখনও সিঁদুরে সিঁথি রাঙিয়ে ঘুরে বেড়াতাম বন্ধুরা সবাই মিলে। মেয়েদের হলের মাঠের একটা অংশ পর্যন্ত ছেলেরা ঢুকতে পারতো পূজোর দিনে। তার একটা বিশেষ আকর্ষন থাকতো তাদের। :) পরের দিন ক্যাম্পাসে দেখা হলে বেশ ভাব নিয়ে কোন ছেলে বন্ধুর মুখ থেকে শুনতাম, "কাল তো তোমাদের হলে ঢুকেছিলাম"!

ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীনই প্রথম মা-কে না বলে এক বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। সময়টা ছিলো পূজার। সেই বন্ধুর আরেক বন্ধুর বাড়ি বসে গল্প করছি, এমন সময় ঠিক পাশেরই পূজা মন্ডপ থেকে তুমুল ঢাকের শব্দে আমার আর প্রিয় বন্ধু শিবার মাথা খারাপের অবস্থা, খালি নাচতে ইচ্ছা করছিলো। পরে আন্টিকে কি একটা বলে ছুতো দিয়ে বারান্দার পাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমার আর শিবার সে কি নাচ!

এখনও পূজা। এখন কোথাও থেকে তুমুল ঢাকের শব্দ শোনা যায় না। তবু এই বিভুঁইয়ে সিংকের কলকে ঢোলের শব্দ ভেবে মস্কিষ্কে আশ্চর্য আলোড়ন ওঠে আমার। স্মৃতির সময় যন্ত্রে চড়ে আমি পাড়ি দেই বহু পুরনো দিনের পথ। ছুঁয়ে আসি অনেকগুলো মমতাময়ী, বিশ্বস্ত হাত- মা'র, বাবার, আমার দুটি সোনা আপুর, আমার পরমপ্রিয় বন্ধুদের।

No comments: